মাঝি ও রাখালের গল্প। বিতান রায়।

166946_184183301660388_100002061587413_385422_2045878265_n

 

আমার নাম কালিপদ। যদিও এই নামে কেউ কোনোদিন ডেকেছে বলে আমার মনে পরে না।
বাবা ডাকতো কালা, মা ডাকতো কালু, পাড়াপড়শিরা ডাকে কাইল্লা,আর আমি যখন নৌকা নিয়ে
ঘাটে থাকি,তখন সবাই আমাকে মাঝি বলেই ডাকে, কারন ওটাই আমার পেশা।আমি এতিম।
আমি দেখতে কাল, তাই আমি বড় হওয়ার পর কেউ কখনও কাছে এসে বলেনি একটু
ভালবাসার কথা, একটু প্রেমের কথা। কারো হাত আমার হাত ধরে বলেনি একটু বস। কারও মাথা
আমার বুকে একটু চেপে ধরে শোনাতে পারিনি বুকের ধকধকানি। শুধু একদিন পরিতোষ মেম্বার
আমার বাম পাসের দুধ টা জোরে চেপে ধরে বলেছিল,” বডি খান ত’ বানাইছস মাইরি”। কিন্তু
সেই চাপে ব্যাথাই পাইছি শুধু।
আমি নৌকা বাই,আমার পেশিতে অসুরের জোড়। আমার নাক চাপটা, ঠোঁট মোটা ,কোঁকরা ছুল,
রঙ কাল, কিন্তু আমি জানি আমার চেয়ে শক্তি ক’ জনের আছে !নদীতে যখন ঝর আসে আমার
চেয়ে কে আগে ডাঙায় পৌঁছাতে পারে! কিন্তু তার পরেও আমার রাত গুলো একা একা নৌকার
ছইয়ের ভিতর কাটে। রাত বাড়লে টের পাই, বড় কাল দণ্ড টা লোহার মত শক্ত হতে থাকে ।
লাফাতে থাকে ,মোচড়াতে থাকে, ছিঁড়ে বেড় হতে চায় লুঙ্গির ভিতর থেকে। আমার হাত
ওকে চেপে ধরে, ও যেন আমার হাতের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করে।আরও শক্ত হয়,চলতে থাকে যুদ্ধ ।
যুদ্ধে সে পরাজিত হয়, বমি করে ভাসিয়ে দেয় আমার লুঙ্গি,আমার হাত, আমার তলপেট, আমার
নৌকার গুঁড়া ।আর আমার শরীর দুলতে থাকে নদীর ঢেউয়ের সাথে।
প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসে পরিতোষ মেম্বার তার বউ কে নিয়া শ্বশুর বাড়ি বেড়াতে যায় জামাই ষষ্ঠীতে।
সে অনেক দূর। হাত চালিয়ে গেলেও একদিনের মামলা। অন্য কোন মাঝি এতদুর যেতে চায়েনা বলে
আমার ডাক পরে। কথা হলও কাল ভোর রাতে রওয়ানা দিতে হবে।তারাতারি ঘুমিয়ে পরলাম।
ভোর ৪ টায় রওয়ানা দিলাম, পউছালাম বিকেল ৫ টায় । যে কয়দিন মেম্বার সেখানে থাকে আমাকে
থাকতে হয় নৌকাতেই ।আমার জন্য সে বাড়ি থেকে খাবার পাঠিয়ে দেয়।
আমি নৌকাতে বসে আছি। কোনও কাজ কর্ম নেই। বসে বসে মাঝে মাঝে আমার লোহার দণ্ডটা দেখি ।
ছোট্ট একতা থাপ্পর দিয়ে বলি, কিরে এত বড় হচ্ছিস কেন দিন দিন?
এমন সময়ে কতোগুলো গরু আর ছাগল নিয়ে একটা চিকন চাকন ছেলে এলো চড়াতে চড়াতে ।একটু
কেমন মেয়েলি ভাব। আমার দিকে চোখ এ চোখ পরতেই একটা কেমন বাঁকা হাসি দিল ।এর আগে কেউ
কখনও এমন করে আমার দিকে তাকিয়ে হাসেনি ।আমার খুব ভাল লাগলো ।কিন্তু কি করব না ভেবে পেয়ে
মাথা নিছু করে বসেই থাকলাম।তাকালাম তখন যখন ও জিজ্ঞাসা করলো, আপনার বাড়ি কই ?
-আমারে জিগাও?
-আপনে ছাড়া আর কেউ কি আছে?
-ও, হ, আমার বাড়ি কাঞ্চা নগর ।
-ওরে আল্লাহ, সে ত বহুত দূর।
-হ,এক দিনের মামলা। তোমার বাড়ি কি এই গ্রামে?
-হ,ওই যে জারুল ফুল গাছটা দেখতেছেন না,ওর পাশ দিয়া যে রাস্তা গেছে তার একটু সামনেই।
-খাড়াইয়া কথা কও কেন? আহো ,আই হানে বহ ।তোমার নাম কি ?
-আমার নাম জামাল। আপনার নাম কি?
-কালিপদ,কেউ কয় কালু,কেউ কয় কালা।কেঊ কয় কাইল্লা।
আমার কথা শুনে ছেলেটা হি হি করে হাসতে লাগল ।
হাসতে হাসতে জামাল ছোট্ট একটা লাফ দিয়ে নৌকায় উঠলো ।আমার ঘাড়ে ডান হাতটা রেখে হালকা একটু
চাপ দিয়ে পাশ ঘুরে সামনের যায়গায় গিয়ে বসলো ।ও যখন পাশ কাটিয়ে গেল আমি খুব সুন্দর বেলি ফুলের
ঘ্রান পেলাম। আর ওর হাতের স্পর্শটা আমার ভিতর কেমন যেন একটা কাঁপুনি দিল।বললাম-
– গায়ে কি মেখেছ?বেলি ফুলের ঘ্রান আসছে ।
-তিব্বত পাউডার ,ঘ্রান টা খুব সুন্দর তাই না।
-হাঁ
-তুমি গায়ে কি মেখেছ?বাঘের মত ঘ্রান পেলাম-
শুনে আমি খুব লজ্জা পেলাম।তাইতো,গায়ে কয়েকদিন সাবান দেয়া হয়নি! নিজের শরীর থেকে নিজেই বুনো
একটা ঘ্রান পাচ্ছিলাম।আমি লজ্জা পাচ্ছি দেখে ও বলল,
-সিংহের মতোও একটা ঘ্রান পাচ্ছি, তুমি সিংহ নাকি?
এবার লজ্জা সংবরন করে বললাম ,কয়েকদিন গায়ে সাবান দেয়া হয়নি,তাই-
ও আমার কথা শেষ না হতেই কাছে এসে বলল, দেখি তো আর কিসের ঘ্রান আসছে?
বলেই আমার বুকের ঠিক মাঝখানে ওর নাক লাগাল।
আমার বুকের ভিতর হৃদপিণ্ডটা হটাত দ্রুত লাফাতে শুরু করল।ও আমার বুক থেকে নাক তুলে বলল, একটা
ঘোড়ার গন্ধ ও পেলাম।বললাম, কালথেকে আর পাবে না,কাল সাবান দিয়ে গোছল করব।
ও বলল, না , তোমার এই ঘ্রান টা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর।এর চেয়ে সুন্দর ঘ্রান আমি আমার জিবনে পাইনি।
একদিকে আমার হৃদপিণ্ডটা চলছে দ্রুত বেগে, অন্যদিকে ওর কথায় দুনিয়ার আবেগ জড়ো হতে থাকে আমার
মস্তিস্কে। বললাম,
তাহলে বেশী করে ঘ্রান নাও না,কে মানা করেছে?বলেই একটু হাসলাম। ও আমার অনুমতি পেয়ে আমার বুকের
সাথে নাকটা জোরে চেপে ধরল। সাথে দু’ হাত দিয়ে আমার শরীরটা। আর পারলাম না।আমার শরীর গর্জে উঠলো।
দু’হাত দিয়ে ওকে আমার কোলের উপর তুলে ফেল্লাম।বললাম, তুমি খুব সুন্দর।ও আমার চোখের দিকে কিছুক্ষণ
তাকিয়ে থাকল। দেখলাম ওর চোখের কোনে অশ্রু। বলল, কেও কোনদিন আমাকে ভালবাসেনি, বিশ্বাস করো সত্যি
বলছি।
আমি আমার বুকের সাথে ওকে জোরে চেপে ধরে বললাম ,বিশ্বাস করলাম।আজ থেকে আমি তোমাকে ভালবাসবো
আমার মন উজাড় করে।
সূর্য কখন অস্তে গেছে টের পাইনি।চারিদিক আঁধার নেমে আসছে।জামালের গরু গুলো ঘরে ফিরবার জন্য ডাক
শুরু করে দিয়েছে। কোন কিছুতেই আমাদের হুস নেই।হঠাৎ একজনের আওয়াজ আমাদের সতর্ক করে দিল,
-ওই জামাইল্লা কই গেলি?আহস না কেন?
জামাল দ্রুত আমাকে ছাড়িয়ে নিল।বল্ল,আম্মা ডাকছে ,আমি যাই ।
আম্মা কাল ছোটো ভাইকে নিয়া নানা বাড়ি বেড়াতে যাবে। কাল দুপুরে তুমি আর আমি কিন্তু একসাথে খাব।
এরপর আমার কানের কাছে মুখ এনে বলল, তোমারে আমি নাম দিলাম শ্যাম কালিয়া।বলে আলতো একটা
চুমু আমার গালে খেয়েই -আইতাছি আম্মা বলে দ্রুত ছুটে গেল। কিছুই যেন ওকে বলতে পারলাম না।ও একটু
পর পর আমার দিকে তাকাচ্ছিল।এক সময় আমার চোখের আড়ালে চলে গেল। আমি অবাক হয়ে দেখলাম,
আমার দণ্ডটা কিছুক্ষণ আগে ও যেভাবে শক্ত ছিল কোন কোন লড়াই ছাড়াই সে চুপটি করে বসে আছে। যেন
আমাকে বলছে,আমি তো আছিই ,আপাতত তুমি ওকে শরিরে না তোমার মনের ভিতর থেকে উপলব্ধি কর।
আমি নৌকার পাটাতন এ চিত হয়ে শুয়ে থাকলাম। কাল জামাই ষষ্টী ।আকাশের পঞ্চমীর চাঁদটাকে যেন
জামালের হাসিমাখা মুখের মত মনে হতে লাগলো ।যেন জামাল চাঁদ হয়ে বলছে ,তুমি কালো তাতে কি?তুমি
সবার চেয়ে সুন্দর। লজ্জায় আমার চোখ বুজে এলো।
***
আজ জামাই ষষ্টি।আজ পরিতোষ মেম্বেরের শশুর বাড়ি ভাল ভাল রান্না হবে। যদিও আমার জন্য
যা আসে তা অনেকটা এরকম ,এক গামলা ভাতের উপর আম কাঁঠাল গুলো লটপটও ,আম না বলে আঁঠি
বলাই ভাল। একটুকরা ভাঙ্গা জিলাপি, মাংসের দু’টুকরা হাড় , মাছের ছোটো একটা লেজ, বেগুন ভাজা ২
টুকরা পোড়া। তারপরেও এ গুলো অমৃতর মত লাগে।
কাল জামাল বলেছিল সাবান দিয়ে গোছল না করতে,কিন্তু তার পরেও সাবান দিয়ে সুন্দর ভাবে গোছল করি।
বগলে আর নিচে একেবারে জঙ্গলে ভরে গেছিলো।একটা বলাকা ব্লেড দিয়ে সব সাফ করলাম।
জামাল এখন আসছে না। মনটা খুব চঞ্চল হয়ে আছে ওর জন্য। দুপুর ১২ টা বাজে। এখনও তার খবর নাই।
ও দিকে খাবার ও আসছে না। সকালে কিছুই খাওয়া হয়নি।খিদে তে পেট চোঁচোঁ করছে। মনে মনে ভাবছি,
ভালই হল, আজ ভাল মন্দ কিছু খাবার আসবে, জামাল কে সাথে নিয়ে খাব।কিন্তু কোথায়ে কি?কার কোন
খবর নেই।কিছুখন পরে একটা সাইকেল ঠেলে পরিতোষ মেম্বার এর শালা খাবার নিয়ে হাজির।
-এই যে তোমার খাবার।আমি সাইকেল নিয়া আসার সময়ে একটা আছার খাইছি।দেহত খুইল্লা খাওন ঠিক ।
আছে কিনা?
-ওই হইব।যা আছে তাতেই হইব।আপনি যান গা।
ছেলেটি চলে গেলে আমি গামছা খুলে ভাতের গামলা বের করি।হায়!একি!সব ভাত,আম, কাঁঠাল ডাল,ঝোল সব মিলেমিশে একাকার।
এই খাবার আমি জামাল কে কি করে খাওয়াব ?লজ্জা লাগতে লাগলো। কি আর করা যাবে, কপালে নাই!!
ছইয়ের ভিতর মন খারাপ করে শুয়ে আছি। হটাৎ জামালের ডাক শুনলাম ,
– কোথায় আমার শ্যাম কালিয়া?
তার কথা বলার ধরন শুনে মনে হল, আমি যেন তার কতো যুগের চেনা !আমার শরীরের ভিতর এমন এক আনন্দের বন্যা এলো, যেন
হাজার বছর ধরে এমনি এক ডাকের অপেক্ষা করছিলাম।
দেখলাম বুকের কাছে গামছা দিয়ে ঢেকে কি যেন একটা নিয়ে এসেছে। সাথে একজগ জল।আমি আড় মোড় ভেঙ্গে উঠে বসলাম। কি
বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। দেখতে লাগলাম অকে।অনেক ক্লান্ত লাগছে,নাকের উপর বিন্দু বিন্দু ঘাম,বুঝা যাচ্ছিল কেবল স্নান করেই
এসেছে ও।চুল ভেজা,সাথে কালকের সেই বেলি ফুলের ঘ্রান।বল্লাম-
-আমি কথা বলবো না,সেই সকাল থেকে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।আর তোমার কোন খবর নেই!
দেখলাম,গামছার ভিতর থেকে কয়েকটি থালা বাটি আড় গামলাতে করে সে খাবার এনেছে।সে গুলো রাখতে রাখতে বলল,
-আমার শ্যাম কালিয়ার বুঝি অভিমান হয়েছে?
-হয়েছেই তো!
-কি করব বল,আম্মা, ছোটো ভাই কামালরে নিয়া গেছে নানা বাড়ি। আমি গরু ছাগল সব ঠিক ঠাক করে,তোমার জন্য রান্না করে তবে তো
আসলাম। ওঠো, বস।দেখ, আমি পুরুষ হয়ে কেমন রান্না করলাম।
আমি খেতে বসে দেখলাম, একী! গামলাতে পলাউ,একটা বাটিতে মাংশ, একটা বাটি তে কই মাছ,ডাল, সালাদ।আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে
গেলাম।আমার চোখ ভিজে গেল।আমি চুপ করে আছি দেখে আরও একটু কাছে এসে বলল,
-কি পছন্দ হয়নি?
আমি আর ঠিক থাকতে পারলাম না, চোখ ফেটে জল এল।আমার বুকে এক প্রবল ঝর উঠে যাচ্ছো ,একে থামাতে হবে।আমি বাঘের মতো
আঁকড়ে ধরলাম জামাল কে। তার ঠোঁট দুটো পুরে নিলাম আমার আমার ঠোঁট এর ভিতর। চোখে আমার আনন্দ অশ্রু,শরিরে আনন্দের বন্যা,
চারদিকে বেলি ফুলের ঘ্রান,আর আমার ঠোঁটের ভিতর পৃথিবীর সকল মধু।আমি খেতে লাগলাম, খেতেই থাকলাম।
জামাল আমাকে ছাড়িয়ে নিয়ে,আমার চোখ মুছে দিয়ে বলল, খেয়ে নাও আগে।এমন মমতা, এমন ভালবাসা,
এমন স্বর্গীয় অনুভূতি আমার প্রাপ্য ছিল ভেবে বুকটা কেমন ভরে ওঠে। আমি ভাত খেতে বসলাম,জামাল পরম
মমতায় বেড়ে দিতে লাগলো। এই অপূর্ব খাবারের সামনে সেই খাবার গুলো বেড় করতে লজ্জা লাগছিল। তবু
বললাম, ঐ খানে খাবার দিয়ে গেছে,বের করব?জামাল বাঁকা হাসি দিয়ে, নাকের ঘামটা মুছতে মুছতে বলল,
আমার গুলো খেয়ে যদি তোমার পেট না ভরে তখন বেড় করো।
আমি আর কিছু বললাম না। জিজ্ঞাসা করলাম তোমার থালা কই?
-আগে তুমি খাও আমি পরে খাব।
-সে হবে না,এক সাথে খাব।
জামাল ভ্রু দুটো একটু নাচিয়ে, নিজের ঠোঁটে আলতো একটা বাঁকা কামড় দিয়ে বল্ল।খেতে পারি, যদি তুমি খাইয়ে
দাও। বললাম,
-আমার এই কালো হাতে খেতে তোমার ঘেন্না করবে না?
আমার কথা শুনে বাথিত হয়ে বলল,
-তুমি তো মাতির দেবতা পুজা কর,সেই দেবতা কে ভোগ দাও,পুজা শেষে অই দেবতা যদি তোমাকে হাতে প্রসাদ
নিয়ে বলে ”খাও”।তুমি কি বলবে, তুমি মাটির তৈরি, আমি খেতে পারব না।
আমি বুঝলাম এর উত্তর আমার জানা নেই।তবু কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম, সে আমার আমার মুখে হাত চাপা
দিয়ে চোখে চোখ রেখে বলল।
-তুমি আমার দেবতা।
এর পরের কথা সবার জানা। আমি ওকে খাইয়ে দিচ্ছি, ও আমাকে খাওয়াচ্ছে , যেমন অপূর্ব খাবারের স্বাদ ,তেমনি
মমতা, ভালবাসা। মন বলল এটাই বুঝি স্বর্গ ।খাওয়া শেষ হলে সে পান বানাল। আমরা পান খেলাম জরদা দিয়ে।
কেমন একটা মাতাল মাতাল ভাব লাগছে–
ও আমার হাত ধরে বাইরে এসে বলল , চল , ওই জারুল গাছের তলাতে বসি। দেখলাম জারুল গাছটা তখন বেগুনি
ফুলে ছেয়ে আছে। দুজনে হাত ধরাধরি করে জারুল গাছে তলাতে আসলাম। খুব সুন্দর জায়গাটা । সামনে দিয়ে নদি
চলে গেছে, লোক চলাচলের পথটাও ঝোপ ঝাড়ে আড়াল করা। জায়গাটা অনেক পরিস্কার। খেজুর পাতা দিয়ে বোনা
একটা পাটি আগে থেকেই রাখা আছে। জিজ্ঞাসা করলাম এটা তুমি এনেছিলে? উত্তরে সুধু ‘হু’ বলল।আমার বুজতে
বাকি রইলো না ,একটা গোপন খেলা তার মনে আগে থেকেই খেলছে। দুজনে বসলাম। হঠাৎ কি মনে করে জামাল
কতগুলো ফুল নিয়ে এলো। তার পাপড়ি গুলো খুলে আলাদা করল,এর পর মুঠো মুঠো আমার গায়ে ছড়ীয়ে দিয়ে বলল,
-এখানে এখন আমাদের ফুলশয্যা হলে কেমন হয়?

কথাটা শুনে শরীরের ভিতর একটা অসুর জেগে উঠলো । একটানে ওকে আমার কোলের উপর বসালাম।
জরিয়ে ধরে পাগলের মতো ওর ঠোঁট চুষতে লাগলাম। ও আমাকে আঁকড়ে ধরে শরীরে কেমন একটা পাক
মারতে লাগলো। আমি ওর ঠোঁট চুষছি, ও আমার ঠোঁট ছুসছে।মাঝে মাঝে ওর জিহ্বাটা আমার মুখের ভিতর
ধুকিয়ে দিচ্ছে,আমি চেটে চেটে খাচ্ছি ওর সেই জিহ্বাটা। এক হাতে ওর চুল খামছে ধরে আর এক হাতে ওর
কানের লতি চুষছি, ও মজা পেয়ে আমার পিঠ খামছে ধরছে আর মুখে পাগল করা আঃ উঃ শব্দ করছে।ধাপ
করে শুয়ে দিলাম মেঝেতে। ওর বুকে এবার মুখ লাগালাম।ওর শরীর এবার সাপের মতো মোচড় খাচ্ছে।ওর
সমস্ত শরীর যেন আমার সম্পদ।আমি চেটে চেটে খাচ্ছি আর খাচ্ছি।নাভি তে জিহবা দিয়ে যেই নারা দিলাম,
ও ভিশন একটা শীৎকার দিয়ে উঠলো। ওর তলপেট কাম্রাচ্ছি,চেটে চেটে খাচ্ছি ওর সমস্ত শরির।ও কখনও
আমার চুল খামছে ধরছে।কখনও পিঠ খামছে ধরছে। এবার একটা হেচকা টানে ওর লুঙ্গি খুলে ফেললাম।
ওঃ ওর সোনা বাবাজি কেমন তিরিং তিরিং করে নৃত্য শুরু করেছে!দেখলাম জামাল একটা মোচড় মেরে একটা
পা একটু তুলে হাত দিয়ে আমার লুঙ্গির গিটঠু খুলে, পায়ের বুড়ো আঙ্গুলে চেপে ধরে হেছকা টানে আমার লুঙ্গীটা
ফেলল খুলে।দেখলাম ওর ওই টুকু শরীরে সে কি বল! মোচড় মেরে আমাকে নিচে শুয়ে দিল।আমার শরীরের
উপর উঠে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
-দুহাত দিতে আমাকে চেপে ধরো।
আমি জোরে ওকে চেপে ধরি।
-আরও জোরে-
আমি আরও জোরে আমার বুকের ভিতর চেপে ধরি।
-আরও জোরে-
আমি যেন আমার সব শক্তি দিয়ে আমার বুকের সাথে ওকে পিষে মারছি।বল্লাম, লাগছে না?
ও বলল লাগছে,সুখ লাগছে,অনেক সুখ লাগছে।
এবার আমাকে ছাড়িয়ে নিয়ে আমার লিঙ্গের ঠিক একটু পিছনে বসলো।দুহাতের আঙ্গুলের নখ দিয়ে আমার শরীরে
হালকা আঁচর দিতে লাগলো।
একধরনের সুরসুরি,একধরনের ভাললাগা ,এক ধরনের কামনা সব মিলেমিশে আমি অপূর্ব এক সুখ পেতে থাকি।
আস্তে আস্তে ওর হাত আমার শরীর বেয়ে তলপেট বেয়ে আমার লিঙ্গটা মুঠি করে ধরল।
-আঃ —
আমি মাতাল হয়ে যাচ্ছি। আমার লিঙ্গটা জামালকে তার সরবচ্ছ শক্তি দেখাচ্ছে।তার মাথাটা যেন বর হতে হতে ফেটে যাচ্ছে।
জামাল তার হাত দিয়ে নারছে, আমার লিঙ্গের ফুটো দিয়ে এক ধরনের পানি বেড় হল।নন্তা স্বাদের পানি।পিচ্ছিল পিচ্ছিল।
দেখলাম জামাল তার জিভ বেড় করে সেখানে ছোঁয়াল। চাঁটতে লাগলো যেন কোন মজার স্বাদের জিনিস এটা।
আমি চোখ বন্ধ করে সুখ পেতে লাগলম।জামাল চাটছে আমার লিঙ্গের মাথা,লিঙ্গের শরীর, অণ্ডকোষ ,আর এর আস পাশ।
আমার শরীরে তখন কামনার উত্তাল উদ্দাম হাওয়া ঝড় হয়ে বইছে।
কিছুক্ষণ পরে আমি ওকে আবার শুয়ে দেই।ওর তিরিং তিরিং বাড়াটা মুঠো করে ধরি।ও যেন আতকে ওঠে।
আমি ওর বাড়াটা আমার নাকের সাথে ঘষতে থাকি।খুব সুন্দর একটা ঘ্রান পাচ্ছি ওর বারা থেকে।কেমন একটা কামনা
মাখা গন্ধ। নাকে ঘসে গালে ঘসে ঠোঁটে ঘসে পুরে নিলাম আমার মুখের ভিতর।
ওঃ, কি গরম সেটা! আমি চুষতে লাগলাম, উপর নিচ করতে লাগলাম,আর জামালের শরীর ঢেউ খেলতে লাগলো সামনের
ওই নদীটার মতো।
কতখন পরে সে তার মাল ঢেলে দিল আমার মুখের ভিতর।
আঁশটে একটা গন্ধ!
এটা কি করব?ফেলে দিব?নাকি কোন কাজে লাগাব?
না,এটা এখন মূল্যবান। একে ফেলে দেয়া ঠিক হবে না।
আমি আমার লালার সাথে মাখানো মাল অরধেকটা আমার লিঙ্গে মাখালাম।বাকি অর্ধেক ওকে উপুড় করে ওর ওর পায়ু পথ
এ ঢেলে দিলাম।এবার আস্তে আস্তে ঢোকাতে লাগলাম ওর ভিতর।ও বলল-
-আস্তে,আস্তে ঢোকাও।
আমি তাই করলাম।আস্তে আস্তে একটু একটু করে ঢুকিয়ে ওর শরীরের উপর শুয়ে পরলাম।বললাম,লাগছে?
-হু,একটু ।আস্তে করে চাপ দাও।আমি আস্তে আস্তে চাপ মারতে লাগলাম।
কিছুক্ষণ পরে ও বলল, জোরে দাও,
আর আমাকে পায়ে কে! কোপাতে থাকলাম আমার ভালবাসার মানুষকে আমার ভালবাসার দণ্ড দিয়ে ভালবাসার আঘাতে।
দর দর করে ঘাম ঝরছে, পাগলের মতো আমার ক্ষুধার্ত লিঙ্গকে খাওয়াচ্ছি যৌন সুখ।
কিছুক্ষণ পরে এলো তিব্র হাওয়া।জেন ভেঙ্গে দিল সব কিছু…আমার চরম সুখ এল।গল গল করে বীর্য ঢেলে ভাসিয়ে দিলাম
জামালের পায়ু পথ।
শুয়ে পরলাম ওর শরীরের উপর।ও উল্টো ভাবে ওর হাত দিয়ে আমার মাথে বিলি কাটতে লাগলো।
জিবনে প্রথম যৌন সুখ পেলাম।এর চেয়ে বেশী কিছু সুখ আর কিসে হতে পারে?
মেয়ে মানুসে?
ধুর, আমি বিশ্বাস করি না।
জামাল উঠলো। ওর চোখে মুখে তখন পরম প্রশান্তি। ওর গামছা দিয়ে আমার লিঙ্গ মোছাল, ওর পিছন মুছল,আমার লুঙ্গি পরিয়ে
দিল।
আমিও ওকে একটু কাছে টেনে নিয়ে ওর গালে আর ঠোঁটে চুমু খেয়ে ওর লুঙ্গি পরিয়ে দিলাম।
কিছুক্ষণ চুপ করে দুজনে বসে রইলাম নদীর দিকে চেয়ে।
জামাল নিরবতা ভাঙল ।বলল-
-এই যে এই জায়গাতে আমি একটা বেলি ফুলের গাছ লাগাব।এর পরে তুমি যখন আসবা আমি তোমাকে বেলি ফুলের মালা
পরিয়ে দিব।
আমি হাসলাম।
-চল আমার নৌকাতে গিয়ে বসি।
নৌকাতে এসে ছইয়ের ভিতর বসে আমাদের কতো কথাই যে হল-
কথার ফাকে ফাঁকে দুস্তুমি করে আমার লিঙ্গ ধরে বলতে থাকল, বাবা!কত বড়–হু, বেচারার ক্ষমতা আছে— এত বড় বানালা
কি খাওয়াইয়া?– খুব সুন্দর গন্ধ এটাতে —এটার ভাগ আমি কাউকে দিব না, ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি কখনও হাসি, কখনও ওর নাক
নেরে দেই। কখন ছোট্ট ছোট্ট করে চুমু খাই।কখনও নাকের সাথে নাকটা ঘসে দেই।আমিও বললাম ,তোমার টাও খুব সুন্দর। বাপরে
ও যখন আমার দিকে তাকাচ্ছিল মনে হচ্ছিল তীরের মতো ফুটো করে দিবে আমাকে।আমি এটার নাম দিলাম রাঙ্গা বউ।
ও শুনে হি হি করে হেসে উঠলো। কি সুন্দর হাসি,কত পবিত্র। কথা বলতে বলতে একসময় বললো,জান,আমার বাবা
যখন বেছে ছিলেন তখন আমি মাদ্রাসায় পরতাম।বাবা মারা যাওয়ার পরে একদিন মাদ্রাসার সাইদি হুজুর আমাকে তার ঘরে আটকে
বলাৎকার করে।তার পর থেকে আর মাদ্রাসায় যাই না।
শুনে আমার কষ্ট হয়।বলি,
-ওই হুজুর কে আমি খুন করব।
ও হি হি করে হেসে বলে ঠিক তো?
বললাম তুমি দেখে নিও।
কথা বলতে বলতে কখন ঘুমিয়ে পরেছি আর মনে নেই।
***

ঘুম ভাঙল পরিতোষ মেম্বেরের বাজখাই গলার আওয়াজ শুনে। বলল, কাল ভোর রাতে রওয়ানা দেব।
রেডি থাকিস। আমি ধর মর করে উঠে বললাম, জ্বি আজ্ঞেু। কিন্তু দেখলাম আমার জান নাই পাশে।
আমার বউ,আমার ভালবাসা!বুকের ভিতর ফাঁকা লাগতে শুরু করলো। এদিক ওদিক তাকালাম, না,
কোথাও নেই। মেম্বার চলে গেল।আকাশে ষষ্ঠীর চাঁদ। আমি হাত মুখ ধুয়ে ছইয়ের উপর উঠে জামালের
আসার পথে বার বার তাকাতে লাগলাম।কিছুখন পরে দেখি সে দৌড়াতে দৌড়াতে আসছে। কাছে এসে বলল,
ও তুমি উঠে গেছো?আমি অভিমানের সুরে বললাম, তুমি আমায় না বলে কেন গেলে,
– তুমি ঘুমাচ্ছিলে তাই ডাকিনি।ও দিকে গরু ছাগলগুলোকে ঠিক ঠাক করে এলাম।
এই বলে সে নৌকাতে উঠলো।হাতে তার পেপসির বোতলে চা,দুখানা কাপ, আর অন্য হাতে মুড়ির মোয়া।
সে কাপে চা ঢেলে দিলো। বললাম,
-তুমি প্রসাদ করে দাও।
-মানে?
-মানে তুমি আমার দেবী।
জামালের মুখখানা লাল হয়ে গেল।সে কাপে একটা চুমুক দিয়ে আমার দিকে বারিয়ে দিল।এভাবে দুজনে এক
চুমুক করে করে পুরো চা শেষ করলাম।
ষষ্ঠীর চাঁদ এখনও আকাশে, হঠাৎ বিষণ্ণ মনে জামাল বলল,
-তুমি কাল চলে যাবে?
-হাঁ,
-তুমি আমার একটা কথা রাখবে?
-কি কথা?
জামাল আমার হাত দুটো চেপে ধরে তার বুকের মধ্যে নিয়ে অশ্রু চোখে বলল,
-একবার বল,আমি তোমার বউ।
-তুমি আমার বউ। আমার বউ।আমার একমাত্র বউ।
-ওই চাঁদ তারাকে সাক্ষী রেখে বল।
-চাঁদ তারাকে সাক্ষী রেখে বলছি তুমি আমার বউ।
-ওই নদীর পানির কসম খেয়ে বল।আমি তোমার বউ,
-ওই নদীর পানির কসম।তুমি আমার বউ।
-আমার মাথা ছুয়ে বল,
আমি তাও করলাম।জামাল হু হু করে কেঁদে আমার বুকে মুখ লুকাল।
কাঁদুক ও মনের সুখে কাদুক।আমি বাধা দিলাম না।

কিছুক্ষণ পরে আমার চোখে পড়লো বিষণ্ণের ভিতর তার সুন্দর একটা মুখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
আমি আমার সব টুকু মমতা দিয়ে দেখতে লাগলাম। বললাম,
-তুমি যে আমার জন্য এত টাকা খরছ করে রান্না করলে টাকা পেলে কোথায়ে?
কিছুতেই যখন বলছিলনা,তখন আমি কসম দিলাম,সে বলতে শুরু করলো-
-আমি গরুর গোবর থেকে ঘুঁটে বানাই,তাই বিক্রি করি,কখনও দুধ বিক্রি থেকে ২/১ টাকা সরিয়ে রাখি।
সেগুলো একটা মাটির ব্যাংক এ জমা করি। এই টাকা দিয়েই আমি আমার লুঙ্গি কিনি,গামছা কিনি,
তিব্বত পাউডার কিনি।
বললাম-
-আমাকে একবেলা খাওয়াবার জন্য সে সব টাকা খরচ করে ফেললে?
জামাল হেসে বলল-
-এ লুঙ্গীটা দিয়ে এ বছর কাটিয়ে দিতে পারব।
আমার চোখ ফেটে জল পরতে লাগলো বল্ম,ল্লাম
-বউ, সামনের জ্যৈষ্ঠ মাসে যখন আসব তখন তোমার জন্য সব নিয়ে আসবো। তখন তুমি আমার সাথে যাবে?
-কোথায়?
-আমরা দুই জনে ঘর বাধবো। একটা ট্রলার কিনব। ওই খানে একটা ছোটো ঘড় থাকবে।আমারা দুরের দুরের
খ্যাপ নিব।অনেক টাকা কামাবো।
-সত্যি আমারে নিবা সাথে?
-সত্যি, সত্যি, সত্যি।
সারারাত আমাদের চলল আদিম খেলা,
ভালবাসার বন্যা,
বিচ্ছেদের বৃষ্টি,
নদীর ঢেউ দোলাতে লাগলো আমার নৌকা,দুলতে থাকলাম আমরা।
***

বাড়ী এসে পণ করলাম, যে করেই হোক এই এক বছরের মধ্যে একটি ট্রলার কিনবই। হোক
ছোট তাতে কি!দিন নেই, রাত নেই,একটা সপ্ন নিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে লাগ্লাম।আমি জানি
আমার বউকে নিয়ে আমি ডাঙাতে ঘড় বাঁধতে পারব না। কিন্তু জলে তো পারব?
আমি স্বপ্ন দেখতে থাকি আমাদের অনাগত ছুটে চলা জীবন।জেখানে সূর্যোদয় হবে জলের কলকল
তানে। সূর্যাস্ত হবে আকাশ রাঙিয়ে। রাতে জ্যোৎস্না সোনা গলানো ঢেউ হয়ে দোলাবে আমার ট্রলার।
তার উপরে দোল খাব আমি আর আমার বউ।
আমার টাকা আসতে থাকে। মানুষের অসাধ্য কি! আমি বৈশাখ মাসে একটা ট্রলার কিনে ফেললাম।
আর দেরি সয় না। পরিতোষ মেম্বারকে বলেছি,এবার তাকে আর তার বউ কে ফ্রী নিয়ে যাবো।
ঠিক হল ষষ্টির দিন ভোর রাতে আমরা রওয়ানা দিব।
যাচ্ছি যাচ্ছি– সময় যেন ফুরাচ্ছেই না! এক বছর পরে আমার বউয়ের সাথে দেখা হবে।কত কি করব!
উফ, ভাবতেই শরীর কাঁটা দিয়ে উঠছে। শিহরন খেলছে সারা গায়, ওই টা, কখন ও জলহস্তির
মতো হুঙ্কার দিচ্ছে, কখন সিংহের মতো কেশর ফুলাচ্ছে, কখন বাঘের মতো হিংস্র হতে চাইছে, কখন
জিরাফের মতো মাথা তুলে আকাশ দেখতে চাইছে, লাফাতে চাইছে যেন রেস এর ঘোড়ার মতো।
দেখতে দেখতে আমার ট্রলার ঘাটে এসে পৌঁছাল। এখনও সকাল,পরিতশ মেম্বার তার বউ কে নিয়া চলে
গেল লাফাতে লাফাতে-
কিন্তু ঘাটের আসে পাশে কোথাও দেখছিনা আমার প্রান ভোমরাকে। আমি ট্রলারের ছাদে বসে রইলাম।জামাল
দের বাড়িটা আমার চেনা হয়নি। খুঁজলে পাব জানি।কিন্তু সে তো জানে আমি আজ আসবো। সে আসবেই-
কিছুক্ষণ পরে দেখলাম জামাল আসছে গরু নিয়ে। কাঁধে সেই গামছা, পড়নে সেই লুঙ্গি।আমি মনে মনে হাসছি।
কারন আমি আজ তার জন্য অনেক কিছু এনেছি।একটা ফুল তোলা জামা, একটা ছাপার লুঙ্গি, একজোড়া
স্যান্ডেল, এক কৌটা তিব্বত পাউডার, আর একটা ভেসলিন। কারন সে বার এটা না থাকাতে জামাল একটু
ব্যাথা পেয়েছিল। আরও এনেছি এক কেজি সন্দেশ, এক হাড়ি দই।
আরে বাঃ, জামাল দেখতে তো আরও সুন্দর হয়ে গেছে এই এক বছরে।আরও লম্বা,আরও ফর্সা, স্বাস্থ্য কি
সুন্দর! এ তো দেখি পুরো সিনেমার হিরো। কিন্তু কই, একবারোও তো আমার দিকে তাকাচ্ছে না!
আমি অভিমান করে অন্য দিকে চোখ ঘুরিয়ে বসে থাকলাম। জামাল গরু নিয়ে যখন একেবারে কাছা কাছি
এলো, একটি কথাও বলছে না দেখে ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, কি বেপার,চিনতে পারনি?
আমার কথাতে জামাল অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল,
-আমাকে বলছেন?
বিস্ময়ে আমি হতবাক হয়ে গেলাম।আমার প্রান ভোমরা আমাকে চীনতেই পারল না!কিন্তু তার গলার স্বর এমন
কেন?
আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ সুচক জবাব দিলে জামাল কাছে এলো।
একী!! এতো জামাল না! ভুলটা বুঝতে পারলাম,এ অন্য কেউ।আমি ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা করলাম,
-জামাল কে চেন?
-কোন জামাল?
এই তো এখানেই গরু চড়াতো, ওই লাল গরুটা তো তারই ছিল মনে হচ্ছে।
ছেলেটা বিমর্শ চোখে তাকিয়ে বলল,
– ভাইয়ার কথা বলছেন?
-তোমার নাম কি কামাল?
-হ্যাঁ, ভাইয়া ওই তো ওই খানে—
বলে আঙ্গুল দিয়ে জারুল গাছটা দেখাল।
-কই, দেখতে তো পাচ্ছি না,
-শুয়ে আছে?
এই সময়ে শুয়ে আছে কেন?দেখা যাচ্ছে না তো!
-ওই খানে মাটির নিচে সারাজীবনের জন্য ঘুমিয়ে আছে।
মুহূর্তে সমস্ত পৃথিবী আমার দুলে উঠলো। আমি সেদিকে তাকিয়ে আছি, কিন্তু মনে হল সব ঘুরছে, সব উলটে যাচ্ছে,
আমার যেন কোন শক্তি নেই, যেন শূন্যে ছুরে দেয়া একটা বেলুন মাটিতে যেভাবে উলটে পালটে মাটিতে পরে যায়
তেমনি ভাবে আ মি মাটিতে পরে গেলাম।
আমার হুস আসলো ভাইয়া ভাইয়া শব্দে। জ্ঞান ফিরতে দেখি আমার মাথার পাশে কামাল বসে আছে।
মুখে জলের ঝাপ্টা মারছে আর ভাইয়া ভাইয়া বলে আমার গাল ধরে ঝাকাচ্ছে। আমার জ্ঞান ফিরলে
আমি কামালকে জড়িয়ে ধরে চীৎকার করে কান্না শুরু করলাম।কান্নায় আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল।
কামাল বলতে লাগলো,
-ও ভাই কি হইছে ভাই?এমন করতেছেন কেন?
ও কয়েকবার জিজ্ঞাসা করলে বললাম,
-জামাল আমার বন্ধু ছিল,
বউ বলতে যেয়েও বলতে পারলাম না।
আমার কান্নার সাথে কামালও ফুফিয়ে উঠলো। বলল,
-আপনি তার কেমন বন্ধু? ওরা সবাই মিলে ভাইয়ারে মাইরা ফেল্ল,আপনি বন্ধু হলে তারে বাচালেন না কেন?
কেন একটা নিরপরাধ মানুশকে মরতে দিলেন?ভাইয়ারে ওরা মারছে, ওরা খুন করছে।
আমার কান্না বন্ধ হয়ে গেলো। কামালকে ছেড়ে উঠে বললাম,
– কারা মেরেছে জামালকে?
আমি কোন ঘটনা জানিনা দেখে কামাল সংক্ষেপে বলতে লাগলো।
-আমাদের জমি বলে কিছু নাই।জায়গা বলতে ঘড় আর গরু ঘড় ওই টুকুই।গত আষাঢ় মাসে মাটির ঘড় ধ্বসে
যায়। ছোটো একটা ঘড় তুলতে ১৫/২০ হাজার টাকা লাগে। গরু বিক্রি করলে সংসার কেমনে চলবে চিন্তা করে
ভিটা বন্ধক রাখি ১৫ হাজার টাকাতে। জমি বন্ধক নেয় সাইদি হুজুর। ভাইয়া আম্মারে মানা করেছিল তার কাছে
বন্ধক না রাখতে। কিন্তু আর কোন লোক না পাওয়া গেলে তার কাছেই রাখা হয়।ওই উছিলায় হুজুর বার বার
আমাদের বাড়ি আসতে থাকে। আম্মা কিছু না জানলেও আমি একদিন ঘরের বাইরে থেকে কান পেতে শুনি, হুজুর
ভাইয়ারে বলছে, ভাইয়া যেন হুজুরের সাথে—-
বলেই থামল, আর বলতে পারলনা। আমি বুঝে নিয়ে বললাম, তার পর কি হল?
ভাইয়া রাজিনা দেখে সে চলে গেল,আর শাসিয়ে গেলো , সে রাজি না হইলে খবর আছে।
এর দুদিন পর, আম্মা বাড়ি নাই, ভাইয়ার জ্বর , আমি গেছি অসুধ আনতে। আইসা দেখি, ভাইয়ার অসুস্থ শরীরের
উপর উইঠা গলা চাইপা ধরে বলাথকারের চেষ্টা করছে।দেইখা একটা দা নিয়া সামনে গিয়া দাঁড়ালাম।
হুজুর ভয় পেয়ে চলে গেলো।
একটু দম নিল কামাল।
আমি কামালের কাঁধে হাত রাখলাম। আমি যাকে পৃথিবীতে সবচেয়ে ভালবেসেছি তার যন্ত্রণার কথা শুনতে আমার
বুকে যে কি পরিমান রক্ত ক্ষরণ হচ্ছিল, তা কোনদিন কাউ কে বোঝানো সম্ভব না।
কামাল শুরু করলো-
-সেদিন সাইদি হুজুর যাওয়ার সময় শাসিয়ে গেলো, এর বিচার সে করবে। প্রথমে সে বন্ধকি বাবাদ ১টা গরু নিয়ে
গেলো। এর পর গ্রামের তার কিছু চেলা পেলারে দিয়ে বলাতে লাগলো ভাইয়া খারাপ ছেলে, সে হিজড়া, সে পুরুষদের
উত্যক্ত করে। সে যুবক ছেলেদের দিয়া তার—–
আবার কামাল থামল।
-কিন্তু আমি জানি ভাইয়া খারাপ না।
-পরে কি হল?
-ভাইয়ারে নিয়া বিচার বসলো। বিচারে সাইদি তার চ্যালাদের যা বলতে বলেছে তারা তাই বলেছে।বিচারে শাস্তি হল
ভাইয়ার।১০ টা ঝাড়ুর বারি, আর গলায়ে স্যান্ডেলের মালা পরিয়ে গ্রাম ঘুরানো। ভাইয়া চীৎকার দিয়ে বলল।
”এ কেমন বিচার? শোনেন সবাই, ওই সাইদি একবার আমারে বলাৎকার করেছে।পরে বার বার চেষ্টা করেছে…।”
কিন্তু ভাইয়ার কথা কেউ শুনল না। একটা গামছা দিয়ে ভাইয়ার মুখ বেঁধে দিলো। হাত বাঁধল। গালায় স্যান্ডেল
ঝুলিয়ে সারা গ্রাম ঘুরাল।
বলতে বলতে কামাল ডুকরে কেঁদে উঠলো।
আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে, বুকে চাপ চাপ বেথা অনুভব করছি। কোন রকমে বললাম।
-তারপর?
-সেই রাতে ওই জারুল গাছে ভাইয়া ফাঁশ নিছে।
আমার চোখ দিয়ে জল পড়ছে ক্রমাগত। কিছু বলার ক্ষমতাও যেন হারিয়ে ফেলেছি।ঝাপ্সা চোখে দেখছি আজও
জারুল গাছটা ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে। সুধু আমার ভালবাসার মানুষটি নেই।আমার সুখ নেই। এ পৃথিবীতে আমার
জন্য যেন আর কিছুই নেই। আমি একা, বড্ডও একা।
কামাল আমার মনের অবস্থা বুঝতে পারলো। বলল ভাইয়া চলেন আমাদের বাড়ি।
আমি না করলাম না। মনে হল আমার যাওয়া উচিৎ। ওখানে গেলে জামালের কিছু একটা পাব যা থেকে আমি
জামালের ঘ্রান পাব!
বললাম,
-কামাল,এখানে কিছু মিষ্টি আছে,আর এই জামা,লুঙ্গি আর স্যান্ডেল টা তোমার জন্য।
তিব্বত পাউডার আর ভেসলিন টা দিলাম না।
আমার উপহার পেয়ে আনন্দে কামালের চোখ নেচে উঠলো।
যেতে যেতে বলল,
-আম্মার শরীরের অবস্তা ভাল না। কেমন যেন পাগল পাগল হয়ে গেছে।
আমার কাছে কামালের কথা গুলো মনে হোল অনেক দূর থেকে ভেসে ভেসে আসছে।
এক দুখিনি মায়ের সামনে যখন দাঁড়ালাম, মনে হোল তার কাছে আমার দুঃখ যেন কিছুই না।
আমি জামালকে যতই ভালবাসিনা কেন, এ ভালবাসার কাছে তা বিন্দু মাত্র। তার নির্লিপ্ত চোখ,
উস্খ খুস্খ চুল। ক্লান্তিতে নুয়ে পরা শরীরটাকে একটু তুলে যখন জিজ্ঞাসা করেছিল;
তুমি কে বাজান?
আমি কোন রকমে তার কাছে যেয়ে তার পা ছুয়ে প্রনাম করে তার মাথাটা আমার বুকে চেপে
ধরে বললাম, আমি তোমার জামাল মা।
শত আঘাতেও মানুষের জীবন আটকে থাকে না ।১ম দিন কেটে গেলো।
মনে মনে কিছু প্রতিজ্ঞা করলাম।সে গুলো পরে বলছি,
এর মধ্যে পরিতোষ মেম্বার কে বলে এসেছি, তাদের সাথে নিয়ে আমি ফিরতে পারছি না।
আমার কিছু কাজ আছে।সে যেন তার মতো করে চলে যায়।
রাতে কামালের সাথে বসলাম জরুরি কিছু কথা বলতে।
সিদ্ধান্ত হোল মাকে দ্রুত ডাক্তার দেখাব।কামাল আমি আর মা একটা বাসা নিব আপাতত, আমার
বাড়ি ভিটা আর কামালের বাড়ি বিক্রি করে যা আসবে গঞ্জে একটা ছোটো দকান দিব।সেখানে কামাল বসবে।
কামাল আর আমি শুয়ে আছি।ঘুম আসছে না, কামালের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে গেছে।হয়েত ও ঘুমিয়ে পড়েছে।
আস্তে করে বাইরে বেড় হয়ে আসলাম।
ট্রলার থেকে তিব্বত পাউডারের কৌটোটা নিয়ে চলে গেলাম জামালের কবরের কাছে।দেখলাম একটা ঝোপের
ভিতর এখনও তার সেই বোনা খেজুর পাতার পাটীটা দলা মোচা হয়ে পরে আছে। কাঁদা মাটি মেখে
আধা ছেড়া হয়ে যেন আমার আসার অপেক্ষা করছিল।
সেটা এনে বিছালাম জামালের কবরের পাসে।এই পাটীতেই একদিন হয়েছিল আমাদের ফুলশয্যা। আর আজ!!
কবরে হাত বোলাচ্ছি, নাকে এলো সেই চেনা বেলি ফুলের গন্ধ।তার মানে জামাল আছে আসে পাশে?
আমি তাকাতে লাগলাম, দেখলাম পাশেই একটা বেলি ফুলের গাছ।অজস্র ফুল ফুটে আছে।ঘ্রান টা ওখান থেকেই
আসছে। সব মনে পড়লো, এ গাছ তো আমার জন্য জামাল লাগিয়েছে।
আমি কাছে গিয়ে গাছটা জড়িয়ে ধরে মাটিতে লুটিয়ে পরলাম।হয়ত ও ভাবেই কাঁদতে কাঁদতে, ভাবতে ভাবতে
আমার তন্দ্রা এসে গেলো। দেখলাম, সামনে জামাল এসে দাঁড়িয়েছে। তার জন্য যে ফুল তোলা জামা এনেছিলাম
সেতাই সে পড়েছে। হাতে এক ছড়া বেলি ফুলের মালা।তার মালা থেকে তার শরীর থেকে বেলিফুলের ঘ্রান
ছরাচ্ছে। জামাল আমার সামনে এসে মালাটা আমার গলায়ে পড়িয়ে দিলো।
পূর্ব আকাশ ফর্সা হয়ে আসছে। স্বপ্ন দেখেছি জেনেও আমার মনে হল, জামাল সত্যি এসেছিল।আমাকে মালা
পড়িয়ে গেছে।
আমি ট্রলার এসে বাকি সকাল টুকু ঘুমালাম।
মোট ৬ দিনের মধ্যে আমাদের কাজগুলো শেষ হয়ে এল।কামালদের বাড়ি আর গরু বিক্রি করে বেশ কিছু টাকা
এসেছে।আমি সেটা কামালকে সাবধানে রাখতে বল্লাম।এরই মধ্যে একদিন চিনে এসেছি সাইদি হুজুরের বাড়ি।
কামাল বলেছিল সাইদি এখন একা থাকে।তার বউ বাপের বাড়ি চলে গেছে ছেলে মেয়ে নিয়ে।এখন মাঝে মাঝে
সাইদি মাদ্রাসার অবুঝ বালকদের এখানে এনে বলাৎকার করে। কেউ জানে, কেও জেনেও না জানার ভান করে।
কেউ কিছু বলার সাহস করেনা।কারন জামালের কথা এখনও কেউ ভোলেনি।
আমি কামালকে কিছুই বললাম না কি করতে যাচ্ছি আমি। শুধু বললাম আজ রাত ১২টায় আমরা রওয়ানা দিব।
কামাল আর মা সব কিছু তুলে অনেক আগেই ট্রলারে চলে এসেছে।বাইরে খুব মেঘ করেছে। বাতাস ও বইছে
অনেক।আমি রাত ১১ তার দিকে ট্রলারে রাখা এক কন্টেইনার কেরসিন নিয়ে রওয়ানা হলাম সাইদির বাড়ির
দিকে। কামাল কিছু দেখল না। ঝড় আশ্ছে।সবার দরজা জানালা বন্ধ। আমি ধির পায়ে দাড়াই সাইদির বাড়ির সামনে।
সামনে পিছনের ২ টা দরজাতে বাইরে থেকে শিকল তুলে দেই। পাশের খড়ের গাঁদা থেকে খড় এনে স্তুপ করি
দরজার সামনে।কেরসিন ঢেলে দেই। তারপর ঠাণ্ডা মাথায় আগুন ধরিয়ে চলে আসি ট্রলারে।
স্টার্ট দিলাম ইঞ্জিনে। ঝড় আসছে ধেয়ে। ট্রলার ছেড়ে দিলাম। ট্রলার মাঝ নদীতে চলে এসেছে।দেখলাম সাইদির বাড়ির
আগুন আকাশ ছুয়েছে।এখন ও কোন মানুষের চীৎকার শুনতে পাচ্ছিনা।সম্ভবত বাতাসের শব্দে কেও টের পাচ্ছে
না। আগুনের শব্দ ,বাতাসের শব্দ, সাইদির চিৎকারের শব্দ সব একাকার হয়ে গেছে।
পাশে থেকে কামাল বল্ল,ভাইয়া কার ঘরে যেন আগুন লেগেছে।আমি বললাম,
-লাগুক,যা হয় হোক, তুমি মার কাছে যাও।
আমি শক্ত হাতে হাল ধরে রইলাম।
কামালদের গ্রাম,সাইদির ঘড় পোরানো আলো,মেম্বারের শ্বশুরবাড়ি, আর জামালেরকবর খানা একটু একটু করে
পিছনে ফেলে তর তর করে চলতে থাকে আমার নতুন কেনা ট্রলারটা।।
সমাপ্ত।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s