জীবন কত অদ্ভুত সুন্দর

tumblr_mfjhkiJqZ51rl5qbto1_500_large

 

ওর সাথে আমার প্রথম দেখা একটা জন্মদিনের পার্টিতে। কালো রঙা শার্টে দারুন লাগছিল তাকে। আমি লুকিয়ে চুরিয়ে দেখছিলাম ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি উচ্চতার শ্যামলা মানুষটাকে। ছেলেটার মাঝে একটা অন্যরকম আকর্ষণ আছে। অনেক মেয়েই তার পিছন পিছন ঘুর ঘুর করছে।
জন্মদিনের পার্টিটা ছিল আমার এক বন্ধুর। ওকে এক ফাঁকে জিজ্ঞেস করলাম , ঐ কালো শার্ট পরা ছেলেটা কে রে ?
ও ! ও তো আমার বড় ফুফুর ছেলে। ঢাকা ইউনিভার্সিটি তে পড়ে। ভালো ফুটবলার। কত মেয়ে যে ওর জন্যে পাগল ! তার হিসেব নেই ।
আমি একটু আশাহত হলাম। যেদিন থেকে বুঝতে শিখেছি আমি ভেতর ভেতর পুরুষপ্রেমী সেদিন থেকেই ইচ্ছে ছিল একজন খেলোয়াড়কে ভালোবাসব। হায় আমার কপাল ! সব স্বপ্নই থেকে যাবে।
কেক কাটা শেষে সবাই খাওয়া দাওয়া শুরু করল। আমার বন্ধু আতিক হঠাৎ সবাইকে ডেকে বলল, উপস্থিত সুধী, আমরা সবাই এখন সৌমর গান শুনব।
আমি পুরোপুরি অপ্রন্তুত। আমি গান গাই সেটা ঠিক। কিন্তু এভাবে হুট করে গান। তাও এত জনের মাঝে ? বন্ধুদের মাঝে প্রায়ই গিটার বাজিয়ে গাই ।
কি আর করা? আতিকের গিটারটা হাতে নিয়ে সবার সামনে দাঁড়ালাম। কিছু কিছু মেয়ে টিজ করছিল আমার দিকে তাকিয়ে।
আমি কোন দিকে না তাকিয়ে শুরু করলাম, দিন বাড়ি যায়, চড়ে পাখির ডানায়।
সবাই আমার সাথে গলা মেলালো। বুঝলাম বোধহয় ভালো হচ্ছে। বেশি উৎসাহ পেলাম যখন দেখি ঐ কালো শার্ট পরা ছেলেটাও গলা মেলাচ্ছে।

গান শেষে সবাই হাততালি। অনেকেই কাছে এসে অভিনন্দন জানাচ্ছে। আমি এমনিতেই একটু লাজুক। সবার প্রশংসা শুনে আরও ব্রিবতকর পরিস্থিতি।
আচমকা পেছন থেকে কেউ একজন ভরাট গলায় বলে উঠল, এক্সকিউজ মি, মি. গায়ক। আমার সাথে কি একটু কথা বলা যাবে?
আমি পেছন ফিরে তাকাতেই মনটা ভালো লাগায় ভরে গেল। ¯্রষ্টা মাঝে মাঝে দু হাত ভরে দেন আমায়। সেই কালো শার্ট পরা ছেলেটা।
আমি একটু হেসে বললাম, আমি গায়ক নই । একটু আধটু গান গাই। তবে আপনি যে পুরোদস্তুর ফুটবলার। সেটা কিন্তু জেনে গেছি। আমি সৌম । আপনি ?
হাসান । আপনার নামটা অনেক সুন্দর। কেমন একটা ¯িœগ্ধ ¯িœগ্ধ ভাব আছে।
পুরুষের সৌন্দর্য কিন্তু ¯িœগ্ধতায় নয়। পুরুষের সৌন্দর্য হল কঠোরতায়।
বাহ বা! আপনি তো দারুন বললেন। লেখালেখি করেন বুঝি ?
আরে নাহ ভাই। তবে পড়তে ভালো লাগে। শীর্ষেন্দু, সমরেশ, বুদ্ধদেব আমার ভালো লাগে।
ও ! হুমায়ুন আহমেদ কি দোষ করলেন ?
হা হা হা । দোষের কিছু না। আসলে এক এক জনের লেখার প্যাটার্ন আলাদা। আমার ওদের লেখা বেশি ভালো লাগে। তবে হুমায়ুনও পড়ি।
খুব সুন্দর গুছিেেয় বলেন আপনি।
আমি হাসলাম। বললাম , আপনিও।
কিছু মনে না করলে আপনার মোবাইল নম্বরটা পেতে পারি ?
অবশ্যই।

সেদিন আর কথা হয় নি। হাসানও আমাকে আর ফোন দেয় নি। আমি কয়েকবার দিতে চেয়েও দিই নি। মানুষের মন। কখন কি ভেবে বসে। তবে ওকে নিয়ে ভাবতে ভালো লাগতো।
ভার্সিটিতে ক্লাস করে কার্জন হল থেকে সবে বেরুচ্ছি। সাথে আতিকও আছে। হঠাৎ দেখি হাসান ভাই , বাইক নিয়ে দাঁড়ানো।
আতিক চিৎকার দিয়ে দৌড়ে গেল। ভাইয়া কবে দেশে আসলে ?
হাসান ভাই হেসে বলল, গতকাল।
আমি কাছে গিয়ে বললাম, কোথায় গিয়েছিলেন ?
হাসান ভাই বললেন, দার্জিলিং । ঘুরতে।
চল । বাইকে ওঠ। আজ তোদের দুপুরে খাওয়াব। কোথায় খাবি বল ?
আতিক বলল, স্টারের কাচ্চি । কিরে চলবেতো ?
আমি হেসে বললাম চলবে মানে কি ? দৌড়বে।

আমি বাইকের মাঝখানে বসলাম। আতিক পেছনে।
হাসান ভাই এর গা থেকে একটা পারফিউমের হালকা সুন্দর গন্ধ।
আমি কি হাসান ভাই এর প্রেমে পড়ে যাচ্ছি। কে জানে ?
প্রেমে পড়লে নাকি সব ভালো লাগে ?
নিউমার্কেটের সামনে প্রচুর জ্যাম। মনে হচ্ছিল, আজকের জ্যামটা যদি শেষ না হত! অথচ এই আমিই জ্যামে পড়লে ট্রাফিকের চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করি।
জ্যাম ছেড়ে গেছে।
স্টারে বসে আতিক আর হাসান ভাই বিভিন্ন ব্যপার নিয়ে হাসাহাসি করছে।
হঠাৎ হাসান ভাই আমায় বলে উঠলেন, কি ব্যপার ? চুপ কেন? গার্লফ্র্যান্ড ছেকা দিছে নাকি ?
আতিক হো হো করে হেসে উঠল। কিযে বল ? ও করবে প্রেম। ওতো পড়েই কুল পায় না।

ওয়েটার কাচ্চি এনে দেওযার পর সবাই খাচ্ছি। আতিকের মনে হচ্ছে জন্মের খিদে পাইছে। বান্দরটা যেভাবে খাচ্ছে। আমি খেতে পারছি না। সবকিছু ওলট পালট ঠেকছে । ওর পাশে বসে খাচ্ছি এটাই আমার জন্যে অনেক কিছু। খাওয়া শেষে হাসান ভাই বলল, চল তোদের নামিয়ে দিই।
আতিক বলল, ভাইয়া আমার হলে একটু কাজ আছে। তোমরা যাও। আতিক চলে গেল।

হাসান ভাই বলল, সৌম চল তোমায় বাসায় নামিয়ে দিয়ে যাই।
থাক আমি যেতে পারব।
যেতে পারবে জানি। কিন্তু আমি তোমাদের ওদিকটা দিয়েই যাব।
আমি বাইকে উঠলাম।
বেশি ভয় লাগলে কাঁধে হাত দিও। হাসান ভাই হো হো করে হেসে উঠল।
আমি কিছু বললাম না।
বাসায় পৌঁছে বললাম, চলেন, চা খেয়ে যাবেন।
হাসান আজ না। অন্যদিন।

হুস করে বাইক নিয়ে চলে গেলেন হাসান ভাই । আমি বাসায় শাওয়ার ছেড়ে গোসল করি। কল্পনা করি হাসান ভাই আমার পেছন দিক থেকে আমায় জড়িয়ে ধরেছেন। আমার কাঁধে চুমু খাচ্ছেন। তার কঠিন পেশীবহুল হাত দুটো আমার ঠোঁট ছুঁয়ে ছুঁয়ে বুক বেয়ে নাভিতে এসে স্থির হয়।
হঠাৎ মার চিৎকারে হুশ এলো।
কিরে একঘন্টা ধওে বাথরুমে কি করিস ? ঠান্ডা লাগবে বাবা ! বেরো !
আমি কোমরে সাদা টাওয়েল জড়িয়ে বাথরুম থেকে বের হই।
আমার রুমের দরজা লাগিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টাওয়াল টা আলতো করে খুলি রাখি।
নগ্ন আমিকে দেখি। ভাবি আমার শরীরের সব জায়গায় যদি হাসানের স্পর্শ পেতাম!

পরদিন । ক্লাস নেই । তাই ঘুমেচ্ছি । কে যেন ফোন করলো। ঘুম ঘুম চোখে নাম না দেখেই রিসিভ করার সাথে সাথেই ও পাশ থেকে হাসান ভাই এর গলা. . . . . .
গায়কের ঘুম ভাংলো ?
আমি আবেগে কি বলবে বুঝে উঠতৈ পারছিলাম না।
কি ব্যপার ! কথা নাই কেন ?
আমি আমতা আমতা করে বললাম, ও গড ! আপনি ?
হ্যা আমি । শোন বিকেল বেলায় ফ্রি থেকো। আজ তোমার গান শুনব। ধানমন্ডি লেকে। গিটার নিয়ে বেরুবে কিন্তু। এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই লাইনটা কেটে দিলেন।

আমার স্কাই ব্লু রং এর টিশার্ট পওে কাঁধে গিটারটা নিয়ে ধানমন্ডি রবীন্দ্র সরোবওে গেলাম বিকেল ৫ টায়। একটু পরেই হাসান ভাই আসল। রেড কালারের টিশার্ট পরে। সবাই ওর দিকে তাকিয়ে আছে।
কি খবর ? নীল মানব ।
লাল মানবের অপেক্ষায় ছিলাম।
কি খাবে ? ফুচকা নাকি চটপটি ?
কিছু না। চা খাব।
ওকে।

দুটো চা হাতে নিয়ে আমরা বসলাম রবীন্দ্র সরোবরের মাঝখানের সিঁড়িগুলোতে।
আমার কাছে সব স্বপ্ন স্বপ্ন লাগছিল।
ও চা খাচ্ছে আর আমাকে বিভিন্ন কথা বলছে।
চা খাওয়া শেষে বলল, এবার গান হোক।
আমি গিটার বাজিয়ে গাইতে শুরু করলাম, যদি হিমালয় হয়ে দুঃখ আসে. . . .
গান শেষে দেখলাম, হাসান ভাই আমার দিকে তাকিয়ে রইল।

দুজনই হঠাৎ চুপচাপ ।
সন্ধ্যা নামার খুব বেশি দেরী নেই। লেকের বুক জুড়ে, দূরের আকাশ জুড়ে একটু পরেই আঁধার নেমে আসবে। লেকের পানিতে দু একটা বোট জালাচ্ছে প্রেমিক জুটি।
হাসান ভাই আমার ডান হাতটা তার হাতে নিয়ে বলল, তোমাকে আমার ভালো লাগে।
আমি কি বলব বুঝতে পারছি না।
শুধু শক্ত করে তার হাতটা ধরলাম। বললাম, জীবন কত অদ্ভুত সুন্দর ! তাই না!

One thought on “জীবন কত অদ্ভুত সুন্দর

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s