গল্প নয় সত্যি ভালোবাসা

আমি সমকামীদের নিয়ে গল্প লিখি শুনে আমার এক ফেসবুক বন্ধু তার প্রথম ভালোবাসার গল্প আমায় শুনাতে চায় । আমিও রাজি হই । তবে সে আমার সাথে সামনা সামনি বলতে চায় । আমি তাতেও রাজি হই । ১৭ ই জানুয়ারি দেখা হয় । সীমান্ত স্কয়ারে । তখন বিকেল ৫ টা বেজে ১৬ মিনিট । আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড আসল । দেরি করে আসার জন্য সরি বলল। আমি ভেতরে ভেতরে একটু বিরক্ত হলেও তাকে বললাম না । কারণ আমি খুব সময় মেনে চলি । আমরা দুজন ধানমণ্ডি লেকের পার ঘেসে হাঁটছি । এক সময় হেঁটে হেঁটে রবীন্দ্র সরবরে পোঁছালাম । সেখান থেকে এক কাপ চা নিয়ে বসলাম । ও শুরু করল তার প্রথম ভালোবাসার গল্প………………………………………………………
২০০৫ সাল । তখন আমি একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়য়ে পড়ি । অবসর সময়ে ঘুরি ফিরি আড্ডা দিই । ইয়াহু তে খুব চ্যাট করতাম । সেখানেই তার সাথে পরিচয় । তখন গে সেক্স ব্যপারটা খুব ভালো করে জানি না । ভাসা ভাসা শুনেছি । ওর নাম ছিল অমি । একদিন আমার সেল নম্বর নিল । তারপর থেকেই মাঝে মাঝে কথা হতো । একদিন ভার্সিটির কাছে এক বার্গার শপ এ বসে বার্গার খাচ্ছিলাম । এমন সময় তার ফোন । সে হাউ মাউ করে কাঁদছে । আমি বললাম কি হয়েছে ?
ও কান্নার চোটে বলতে পারছিল না । আমি তাকে আমার ওখানে আসতে বললাম ।

কিছুক্ষণ পর সে আসল । এসে আবার কান্না । আমি পুরপুরি অপ্রস্তুত । আশেপাশের মানুসজন তাকিয়ে দেখছিল । আমি তাকে শান্ত হয়ে বসতে বললাম । ও বসল ।
এরপর যা শুনলাম তা হল… ওর লাভারের সাথে ওর ব্রেক আপ হইসে ।
আমি হালকা পাতলা সান্ত্বনা দিলাম ।
এরপর থেকেই আমি ওকে সময় দিতাম, একসাথে দুজন ঘুরতাম ।
কিছুদিন পরেই ছিল দুর্গা পুজা । আমরা দুজন মিলে পুরো ঢাকা ঘুরে পুজা দেখলাম ।
একটা সময় বুঝতে পারছিলাম ও আমার প্রতি দুর্বল ।

বেশ কিছুদিন পর শাঁখারি বাজার যাই দুজন । একটা কালি মন্দিরে । সেখানে বসে দুজন বসে কালি মূর্তির কাঠামো বানানো দেখছিলাম । ও হথাত আমায় বলল, আমি যা চাইব তাই দেবে ?
আমি বলছি, হুম ! বল ।
ও বলল, আই তোমাকে চাই ।
আমি বললাম , কেমন করে চাও ।
অমি বলল, আমার মা যেভাবে বাবা কে চায় ।
আমি বললাম , তোমার মাথা কি ঠিক আছে ?
এটা কি আমাদের সমাজ মানবে ?
ও বলল, আমরা লুকিয়ে বিয়ে করব । কিন্তু সব আচার অনুষ্ঠান মেনে ।
আমি মোহের মত সব মেনে নিলাম ।

আমরা ঠিক করলাম বিয়ে করব । শাঁখারি বাজার থেকে শঙ্খের আংটি কিনলাম । যেহেতু সে ছেলে তাই শাঁখা পড়তে পারবে না তাই এই ব্যবস্থা । গলায় মঙ্গল সুত্রের পরিবর্তে একটা ওম লেখা লকেট কিনলাম ।
তারপর একদিন লগ্ন দেখে আমাদের কুল মন্দিরের সামনে দেবতাকে সাক্ষী রেখে ওর কপালে আঙ্গুলের রক্ত দিয়ে সিদুর পরিয়ে দিলাম । ও আমায় প্রনাম করল ।
এবার ওর বাসায় ও আমার বন্ধুদের দাওয়াত করল । অনেকটা বরযাত্রীর মত ।
দিনগুলো সুখেই যাচ্ছিল । স্বপ্নের মত । আমাদের মাঝে সেক্স তখনও হয় নি । শুধু ভালোবাসা আর আবেগ । দুজন ক্লাস করে সারা ঢাকা শহর টই টই করে ঘুরে বেরাতাম । কখনও ফুচকা, কখনও বার্গার । কখনও সিনেমা । বেশ চলছিল ।
বিয়ের পর প্রথম যেদিন ওর বাসায় গেলাম । নিজেকে খুব সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছিল । নিজেকে সত্যি জামাই জামাই লাগছিলো । ও ওর বাবা মা ছোটো ভাই আর কাকার কাছে বলল, আমি তার খুব ভালো বন্ধু ।ওর মা আমায় নিজের ছেলের মত আদর করত । এখনও ভুলতে পারি না মাসিমার মুখটা । মাসিমা সাজতে খুব ভালবাসতেন । কপালে বড় সিঁদুরের টিপ পরতেন । ওর ছোটো ভাইটা আমার খুব পাগল ছিল । মনে হতো ও বোধয় আমারই ছোটো ভাই । ভালই যাচ্ছিল সব । আমার সব কিছু সে পছন্দ করে দিতো । আমার জন্য এটা কিনত ওটা কিনত । কিন্তু বিনিময়ে ওর সব জিনিস আমার কিনে দিতে হতো । আমার তখন খুব কষ্ট হতো । কারণ তখন আমি ছাত্র ছিলাম। টাকা ছিল না এখন কার মত । তারপরেও চেষ্টা করতাম । ওর প্রয়োজন মেটানোর । কেননা ধর্মমতে আমরা জামাই বউ ।
বিয়ের কয়েকমাস পেরিয়ে গেল । কিন্তু আমাদের মাঝে তখনও বাসর হয় নি । একদিন আমার বাসায় কেও ছিল না । আমি ওকে আমার বাসায় আসতে বললাম । ও আশার আগেই ওর জন্য ফুচকা এনে রাখলাম । ও খুব পছন্দ করত তাই । ও এসে ফুচকা দেখে খুশিতে আত্মহারা । দুজন মিলে গল্প করছিলাম । হথাত ও আমাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে লাগলো । আমি নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারলাম না । ওর সারা গায়ে আমার আদর দিলাম । ওকে কোলে করে আমার বিছানায় শুইয়ে দিলাম ।
ওর পা থেকে মাথা পর্যন্ত এমন কোন জায়গা নেই জ আমি তাকে চুমু খাই নি ।
ও বারবার চিৎকার করে আমায় জড়িয়ে ধরেছিল । আনন্দে । আমিও একটা নতুন সুখ পাচ্ছিলাম । ভালোবাসার মানুষ কে যখন শরীর দিয়ে পাওয়া যায় এর মত পূর্ণতা নেই ।
সব কিছু শেষে আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি সুখি ?
ও অনেক রেগে গেল । আমি ক্ষমা চাইলাম । ও হাসল ।

মানুষের জীবনে সুখ বেশিদিন সয় না । এটা আগে বিশ্বাস করতাম না । কিন্তু নিজের জীবনে যখন আসল তখন বিশ্বাস করলাম । ও কেমন জানি বদলে যেতে লাগলো । আগের মত ফোন দেয় না । কথা বলে না । কেমন একটা পরিবর্তন ।
আমি গোপনে গোপনে খবর নিলাম । জানতে পারলাম অমি তার আগের বয় ফ্রেন্ডের সাথে দেখা করে । কথা বলে । আমি কথাটা বিশ্বাস করলাম না । একদিন ধানমণ্ডি তে একটা কাজে আসি । হথাত দেখি আমার পাশের রিকশায় আমার ভালোবাসা তার প্রাক্তন লাভারের সাথে ঘুরছে আর হাসছে । আমি সাথে সাথে ওকে ফোন দিলাম ।
কোথায় তুমি ?
আমি ভার্সিটিতে । কেন ?
না এমনি ।

আমার মন খুব খারাপ হয়ে গেল । দিন দিন আমার আর ওর সম্পর্ক খারাপের দিকে যেতে লাগলো । আমি ওকে মাঝে মাঝে এসব নিয়ে জিজ্ঞেস করলে সে সব এড়িয়ে যেত ।
শেষ পর্যন্ত একদিন আমি আর সে আমাদের সেই মন্দিরে দেখা করি ।
ও দেবতার মূর্তির দিকে তাকিয়ে বলে, আমি তোমার কাছ থেকে মুক্তি চাই ।
আমি কি বলব বুঝতে পারছিলাম না । আমি ওকে বুঝাতে চেষ্টা করি ।
আমি ওকে বলি পাগলামি না করতে । আমরাত বিয়ে করেছি । দেবতা সাক্ষী রেখে । এটা নরমাল সেক্স না ।
ও কিছু বুঝেনা । পাগলা কুকুরের কত হয়ে যায় । ও বলে , আমি কিছু জানি না । আমি মুক্তি চাই । আমি এবার মাথা ঠাণ্ডা করে বললাম, ওকে তুমি যদি তাতে সুখি হও তাহলে তাই হোক ।
ও চলে গেল ।
আমি নিরব হয়ে তাকিয়ে থাকলাম ।
এরপর থেকেই আমার একলা জীবন । কিছু ভালো লাগত না । মনে হতো যদি দূরে কোথাও পালিয়ে যেতে পারতাম। বেচে যেতাম । সারাক্ষণ ওর কথা মনে পড়ত ।

কিছুদিন পর ওর জন্মদিন । এর মাঝে ওর সাথে আর কথা হয় নি । ওর জন্মদিনের দিন আমি দোলনচাঁপা, লাল গোলাপ নিয়ে ওর বাসায় গেলাম । আমি এতো ফুল নিয়ে গেছিলাম যে ওর মা পুরা অবাক । ওর মা আরও অবাক আমাকে দেখে । কারণ ও নাকি ওর মাকে বলেছিল যে আমি নাকি দেশের বাইরে চলে গেছি ।
ওর মা ওকে ফোন দিল । সাথে সাথে রেগে গিয়ে বলল সে আমার সাথে কথা বলবে ।
আমি ফোন কানে নিতেই, ও আমাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালি দিয়ে বলল, তোর যদি লজ্জা থাকে এখনি বেরিয়ে যা । আর কখনও আমার বাসায় আসবি না ।
আমি হতবাক হয়ে গেলাম ওর মুখের কথা শুনে ।
আমি মাসিমাকে বললাম, মাসিমা! আমি একটু আসছি । মাসিমা আমাকে আসতেই দিবে না । আমি তারপরেও ঘর থেকে বের হলাম ।
ওর বাড়ির সামনেই একটা ছোট্ট মাঠ ছিল। সেখানে ওর ছোটো ভাইটা খেলছিল । ও আমাকে দেখে দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল ।
ওর ভাইটা কেঁদে কেঁদে বলল, তুমি কই ছিলে এতদিন? আসনি কেন? আমার দাদা খুব খুব পচা………অমি দাদা একটুও ভালো না……… একটুও ভালো না।
আমি কিছু বললাম না । ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম, ভালো থাকিস তুই ।
আমার বুকটা ছিরে যাচ্ছিল ।
অমি আমার সাথে এমন কেন করল । আমিতো জেনে শুনে কোন পাপ করিনি । তাহলে কেন এমন হল !
এরপর থেকে আসতে আসতে বদলে যেতে লাগলাম । আমি আজও জানি না অমি আমার সাথে কেন এই খেলা খেলল ?

**************************************************************
গল্প শেষ করে আমার ফেস বুক ফ্রেন্ড লেকের পানির দিকে তাকিয়ে আছে । আমি চুপ । আমার ফেস বুক বন্ধুর চোখে চশমা । তার ভেতর দিয়েও আমি তার চোখের জল দেখতে পাচ্ছিলাম । মানুষ কত ভালবাসে !
আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, এখন ওকে ঘৃণা করো না ?
আমার বন্ধু বলল, না । কারণ ও আমাকে ভালোবাসা কি তা শিখিয়েছে । মানুষ নিজেই নিজের সাজা এই দুনিয়াতে পায় । শুনেছি ও আর কারও সাথে সেটল হতে পারে নি । হয়ত এতাই তার শাস্তি !
আমি পরিবেশটা হালকা করার জন্য বললাম, তারপর তোমার গল্প যে লিখব ! বিনিময়ে আমি কি পাব ?
আমার ফেস বুক ফ্রেন্ড বলল, চল তোমাকে আজ ডিনার করাব ধানমণ্ডির কড়াই গোশততে ।
আমি আর আমার ফেসবুক বন্ধু উঠলাম । এগুতে থাকলাম । পেছনে পরে রইল একটা সত্যিকারের সমপ্রেমের গল্প ।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s