বুনো হয়ে যাই


বাসের জানালা দিয়ে ভোর দেখছি । আকাশে অল্প অল্প আলোর রেখা । কোথাও লাল । কোথাও আকাশী ।
বছরের এই সময়টা আমার দারুন লাগে । না গরম । না শীত ।
বাসের বেশিরভাগ মানুষ ঘুমোচ্ছে । আমি ঘুমই নি । সারা রাত । একটা অপেক্ষা আমার বুক জুড়ে ।
বাস এখন সীতাকুণ্ড পেরুচ্ছে । ওপাশের পাহাড়ের গায়ে গায়ে হালকা কুয়াশা । কেমন যেন ঘোর লাগা একটা সময় ।
একটু পরেই তোমার দেখা পাব । আহ । কতদিন পর !
সেই কবে তোমার ঠোঁট ছুয়েছিয়াম । মনে নেই ।
আমি কেন আর দশটা মানুষের মত হতে পারি না । কে জানে ?
কেন শরীর দিয়ে শরীরের ঘ্রান নিই না !
আমার সমকামী বন্ধুরা বলে,তুই বড্ড সেকেলে । অভি ।
আমি ওদের বলি, সবাই যদি তোদের মত হয় ? তাহলে কি চলবে ? কেউ কেউ আমার মত সেকেলে হয়েই থাকবে ।

আধ ঘণ্টা পর নামলাম । বাস থেকে । আমার সাথে বেশি কিছু নেই । কাধে একটা ব্যাগ । তাতে কিছু কাপড় চোপড় ।
বেশ লাগছিলো । চারপাশ ।
জব করি । তাই সময় হয় না ঢাকার বাইরে যাবার ।
তাই তোমার সাথে দেখাটাও আগের মত হয় না ।
তুমি এখানে নতুন পোস্টিং নিয়ে এসেছ মাস তিনেক হল ।
এখানকার কোয়ার্টারে থাকো । একা একা । ভীষণ হই হুল্লোড়ে তুমি এই শান্ত এলাকায় কেমন করে থাকো সেটা কিছুটা অবাক করা ব্যপার ।
তোমার সেল ফোনে কল দিলাম । ধরলে না । নিশ্চয়ই ঘুমাচ্ছ ।
অবশ্য তুমি বরাবরই ঘুম কাতুরে । সমস্ত দুনিয়া একদিকে । আর ঘুম একদিকে ।
একটা রিকশা নিলাম । আশে পাশের দোকান পাঠ এখনও খুলে নি । নাহলে কিছু নাস্তা কিংবা বিস্কিটের প্যাকেট কিনে নিতাম ।
তুমি যে বেখেয়ালি । দেখা যাবে বাসায় গিয়ে কিচ্ছু নাই ।
রিকশার টুংটাং আওয়াজ বেশ লাগছে ।
এখানকার বাতাস টা অদ্ভুত । কেমন একটা মিষ্টি গন্ধ ।
কোন ধুলো নেই । ধোঁয়া নেই ।
তোমার মুখে শোনা কথা আর গল্পের সাথে চারপাশ মিলিয়ে নিচ্ছি ।

এইতো সামনে শিমুলের একটা গাছ । সারা গাছজুরে একটাও পাতা নেই । শুধু রক্তরাঙ্গা লাল লাল ফুল ।
আমি রিকশা থামালাম ।
অনেক শিমুল পরে আছে । গাছের গোরায় ।
আমি কিছু শিমুল কুড়লাম ।
রিকশাওয়ালা লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে হাসে । বলে, ভাইজান । আফনে বুজি ডাহায় তাহেন ?
আমি মুখে মৃদু হাসির রেখা টেনে বললাম, হুম ।
এইহানে কার কাসে আইসেন ?
আমি বললাম, তোমাদের ডাক্তার ভাই এর কাছে ।
রিকশাওয়ালা বলে, ও । শিহাব ডাকতর ।
আমি বললাম, হুম । এখানে কি ওকে সবাই চেনে ।
লোকটা বলে, হা । আমাদের এইহানে একটাই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স তাই হজ্ঞলে চেনে ।

আমার কেমন জানি একটা ভালো লাগা মন ছুঁয়ে গেল ।
তুমি খুব হাসি খুশি টাইপের একটা ছেলে । সহজেই মিশতে পার ।
তোমার চেহারার মাঝেও অসাধারণ একটা টান আছে । যা সবাইকে টানে ।
আমাদের কবিতার দলে যখন তুমি কবিতা পড়তে । তখন সবাই তোমার দিকে পিনপতন নিরবতায় তাকিয়ে থাকত ।
তোমার কবিতা শুনেই তোমার প্রেমে পড়ি আমি । তখনও জানতাম না তুমি মেডিকেল এ পড়ছ ।
আমি বাংলায় পড়েও তোমার মত করে সাহিত্য কিংবা কবিতা বুঝতাম না ।
তুমি যখন সুনীলের কেউ কথা রাখে নি কবিতাটা শুনাতে । আমার বুকের ভেতর কেমন মোচড় দিয়ে উঠত ।

রিকশা তোমার কোয়ার্টারের সামনে আসল । আমি ভাড়া মিটিয়ে নামলাম ।
এখানে একটা উঁচু টিলার উপর তোমার কোয়ার্টার ।
কেমন যেন ছবির মত ।
কোয়ার্টারের পেছনেই গাছের সাড়ি ।
আমি এগিয়ে যাই ।
তোমার কোয়ার্টারের গেটে নক করি ।
একটু পর একটা দারোয়ান গেট খুলে দেয় । আমায় বলে, আপনে কে ?
আমি বলি, চাচা ,আমি অভি । আপনাদের ডাক্তারের বন্ধু । ঢাকা থেকে আসছি ।
দারোয়ান চাচা বলে, আসেন আসেন । স্যার গত কাল বলসিল যে আপনে আসবেন । কিন্তু সারেরত সকালে আপনাকে আনতে যাওয়ার কথা ছিল । হয়ত ঘুম থেইকা জাগবার পাড়ে নাই ।
লোকটা অপরাধির মত বলল ।
আমি হাসলাম ।
লোকটা আমাকে নিয়ে তোমার কোয়ার্টারের ২ তলায় গেল ।
বলল, আপনে নক করেন । স্যার বোধহয় গুমাচ্ছে ।
দারোয়ান চলে গেল ।
আমি নক করলাম । একবার, দুবার , তিনবার ।
উফ । এতো ঘুমাতে পার তুমি ?
আচমকা দরজা খুলে আমার দিকে তাকাল ইফতি । ছোটো বাচ্চার মত চোখ এখনও কচলাসসে ।
আমাকে দেখে ওর চিরাচরিত একটা বিখ্যাত হাসি দিল, কানে আঙ্গুল দিয়ে ধরে বলল, সরি । ঘুমাছিলাম । টের পাই নি । তোমার জায়গা চিন্তে কষ্ট হয় নিতো?
আমি অবাক হয়ে দেখছিলাম । আমার ভালোবাসা কে ।
কোন কথা না বলে ঘরে ঢুকেই দরজা আটকে ব্যাগ টা ফেলেই ওর বুকে ঝাঁপিয়ে পরলাম ।
কেন জানি আমার সমস্ত শরীর জুড়ে কান্নার একটা স্রোত বয়ে গেল ।
আমি কাঁদতে লাগলাম । আনন্দে । অনেকদিন পর কাওকে বুকে পেয়ে ।
ইফতি আমার মাথায় হাত বুলায় । বলে, অভি । এতো ভালবাস কেন ? আমারও কিন্তু কান্না পাচ্ছে । কেঁদে দিব কিন্তু ।
আমি তোমার বুক থেকে মাথা তুলি না ।
বলি , তোমার সারা শরীর থেকে বুনো একটা গন্ধ পাচ্ছি । কয়দিন গোসল করো না বলতো ?
ইফতি হাসে । বলে, আমিতো অনেক আগে থেকেই বুনো পুরুষ । সেই জন্যই তুমি আমায় ভালবেসেছ ।
আমি বলি, আজ গোসল করিয়ে দিব ।
ইফতি হাসে । বলে, আমি তিন পায়ে রাজি ।
আমি ইফতির গলায় চুমু দিই । বলি, বুনো ডাক্তার । চল বুনো হয়ে যাই ………………।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s