একা


রাতের আকাশে এখন অর্ধেকটা চাঁদ । শহরের অতি আলোময় এক ঝলমলে এলাকার কোন এক সুউচ্চ দালানের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি । আমার ব্যক্তিগত ল্যাপটপে গান বাজছে , তুমি কোন কাননের ফুল কন গগনের তারা ।
মনটা আশ্চর্য রকম খারাপ ।
মাঝে মাঝে এমন হয় তখন খুব পাগল পাগল লাগে ।
বারান্দায় রাখা গাঁদা ফুলের গাছগুলোতে হাত বুলাই ।
আচ্ছা ! ওদের কি আমার মত সুখ দুখের অনুভূতি আছে ?
আমার চোখ ভেজা ।

ছোটবেলা বেলা থেকেই অনেক অভিমানি আমি ।
তবে আমার অভিমানগুলো কখনই বুঝতে দিই না আমি ।
মা যখন ছোটবেলায় আমায় কড়া কথা বলত আমি দরজা আটকিয়ে ঘর আঁধার করে বসতাম ।
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতাম ।
যখন একটু পর চোখ মুখ লাল করে বের হতাম । মা ঠিক বুঝত । মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদত ।
আমিও তখন কাঁদতাম । তবে বরাবরই আমার কান্নার কোন শব্দ হত না ।

আজ কেন কাঁদছি । জানি না ।
আশ্চর্য একটা অনুভূতি হচ্ছে বুকের ভেতর ।
আমি কি মাঝে মাঝে নিজের সীমাবদ্ধতা আর সীমার কথা ভুলে যাই ?
কে জানে ?
হয়ত যাই ।
আমিও মানুষ ।
এই জন্যই সবার কাছ থেকে দূরে দূরে থাকি । অনেকেই আমাকে অহংকারি বলে । কেউ বলে রহস্য মানব ।

জীবনের এতটা পথ পার হয়ে এসেছি । কখনও ভালোবাসা বুক ভরে নিয়েছি ।
আবার কখনও কখনও কারো অভিশাপ নিয়েছি মাথা পেতে ।
কাওকে কাওকে কষ্ট দিয়েছি ।
বিনিময়ে কষ্টও পেয়েছি ।
‘ভাইজান, আফনার কি মন খারাপ ?’ বুয়া চা হাতে আমার দিকে তাকিয়ে বলল ।
আমি বললাম, কই নাত ।
বুয়া চা এর মগ রেখে চলে যায় ।
আমি অল্প করে ঠোঁট বুলাই চা এর মগে ।
মনে মনে ভাবার চেষ্টা করি, আচ্ছা । আমি কি সুখি ?
সবাই আমাকে সুখি বলে ।
আমি সবাইকে দেখাই আমি খুব সুখি । আমারও যে বুক পোড়ে গোপনে গোপনে । কাওকে বলি না ।
মানুষ বোধহয় মানুষের দুর্বল অনুভূতি নিয়ে খেলতে পছন্দ করে । সেই ভয়ে !
কেউ যখন আমার কাছে আসতে চায় । আমার হৃদয় ছুঁতে চায় । তখনই তাকে সাবধান করি ।
নিজেকেও মনে মনে সাবধান করি ।
কারণ কিছু কিছু মানুষ সারা জীবন একা একাই থাকে ।
কোন একজন লেখকের বইয়ে পড়েছিলাম, যে সবাইকে হাসায় তার বুকের ভেতর কষ্টের পাহাড় থাকে ।
আমার বুকের ভেতরও কি কষ্টের পাহাড় আছে ?
কি জানি ? কখনও খুঁজে দেখি নি ।

চা শেষ করে পায়ে স্যান্ডেল গলিয়ে বেরুলাম ।
সেলফোনটা ইচ্ছে করেই সাথে নিই নি ।
মাঝে মাঝে সেল ফোন খুব বিরক্ত লাগে ।
মনে হয় কেউ যেন সারাক্ষন চোখে চোখে রাখছে ।
পথ ধরে হাঁটছি ।
আমার যখন ভীষণ মন খারাপ লাগে । তখন হাঁটি ।
হারিয়ে যাবার চেষ্টা করি ।
ইচ্ছে করে হারাই ।
মন যেদিকে চায় সে পথ ধরে হাঁটি ।
আজও তাই করছি ।

একটু একটু বাতাস বইছে ।
হাঁটতে হাঁটতে কখন যে লেকে চলে এসছি খেয়াল নেই ।
আমি চুপ করে জলের পাশে বসি ।
জলের বুকে শহরের লাল নীল আলো । কাঁপছে ।
আমি তাকিয়ে থাকি ।
বাইজান, চা খাবেন ?
একটা ছোট ছেলে আমার দিকে তাকিয়ে বলে । বয়স ৭ কি ৮ হবে ।
আমি হাসলাম ওর দিকে তাকিয়ে । বললাম , না রে । চা খাব না ।
টা হইলে সিগারেট খান ! ছেলেটা আবার বলল ।
আমি আবারও হাসলাম, আমি সিগারেট খাই না ।
ছেলেটা আশাহত । বলল, বাইজান । এমনিতেই দেশের যা অবস্থা ! বেচা বিক্রি নাই । কি কইরা যে খামু !
আমার মায়া লাগে ।
ছেলেটাকে বলি, তোমার মা বাবা নাই ?
ছেলেটা বলে বাপে মায় রে ছাইড়া গেসে গা । মায়ের অসুক । আগে কাম করত । এখন কিছু করতে পারে না ।
আমি বললাম, ও ।
ভাইজান , একটা চা দেই ? ছেলেটা বলল ।
আমি বললাম, আচ্ছা দেও । অন্তত ছেলেটার সাথে কিছুক্ষন কথা বলা যাবে ।
ছেলেটা যত্ন করে চা ঢালে ।
কাপ এগিয়ে দেয় ।
আমি চা এর কাপে চুমুক দিই । বলি, তোমার নাম কি ?
ছেলেটা বলে, বাইজান । আমার নাম মোবারক ।
আমি বললাম, ও । ভালো নাম ।
ছেলেটা তার হলদে দাঁত বের করে হাসল ।

আমি ছেলেটাকে বলি, মোবারক । আজ আমার অনেক মন খারাপ । তুমি আল্লাহর কাছে আমার জন্য একটু দোয়া বল উনি যেন আমার মন ভালো করে দেয় ।
মোবারক আবারও হাসে । বলে, বাইজান ! ভাবির সাথে কি ঝগড়া হইসে ?
আমি হা হা করে হেসে উঠি ।
মোবারক অবাক চোখে তাকায় ।
আমি মোবারক কে বলি, না ।
মোবারক বলে, বাইজান । আফনে এমতে কইরা হাসলেন কেন ?
আমি বললাম, এমনি ।
চা এর চাপ টা ওর হাতে দিই ।
মানিব্যাগ থেকে খুচরো টাকা বের করে দিই ।
মোবারক আমার দিকে তাকায়ে বলে, বাইজান । আফনে অনেক বালা ।
আমি বললাম, কেন ?
মোবারক বলল, হেই ডা কইতে পারুম না ।
মোবারক ওর ডান হাতে চা এর ফ্লাস্ক আর বিস্কিটের প্যাকেট ঝুলিয়ে হাঁটে । ফ্লাস্ক এর ভারে ওর ছোট শরীরের ডান হাত এর কনুই বেশ ঝুকে থাকে মাটির দিকে ।
আমার মন আবার খারাপ হয়ে যায় ।
এইটুকুন মানুষটা কত কষ্ট করছে ?
আর আমি মন খারাপ বলে পথে পথে হাঁটছি !

বসা থেকে উঠে দাঁড়াই ।
হেঁটে হেঁটে সামনের ব্রিজটাতে বসি ।
ব্রিজটার রেলিঙে বসি ।
পা ঝুলিয়ে ।
লেকে এখনও কিছু জুটি নৌকা চালাচ্ছে । হেসে কুটি কুটি হচ্ছে ।
আমি ওদের দেখি ।
ওদের ভালোবাসা দেখে বুকের কোথায় যেন একটা ব্যথা হয় ।
আমরা সমকামীরা কত স্বপ্ন দেখি ।
কখনও স্বপ্ন দেখি প্রিয় কারো হাত ধরে নিঝুম রাতে পথ হাঁটার ।
কখনও স্বপ্ন দেখি সাগরের পাশে চুপ করে দুজন বসে থাকার ।
কখনও ভীষণ সুন্দর চাঁদনীর আলোতে ভিজে ভিজে একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকার স্বপ্ন ।

যারা হয়ত ভাগ্যবান । তারা কিছুটা সময়ের জন্য পেয়ে যায় সেই অলৌকিক সুখের স্পর্শ ।
আর যারা দুর্ভাগ্যবান । তারা শুধুই শরীরের মাঝে সুখ খুঁজে বেড়ায় ।
জীবন কি অদ্ভুত !
আমার বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয় ।
আমি তাকাই আকাশের দিকে ।
দিনশেষে , বেলা শেষে আমরা প্রতিটা সমকামিই বোধহয় একা । ভেতরে ভেতরে খুব একা !!

One thought on “একা

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s