কখন হল মন দেয়া বুঝি নি

581936_220995294711530_1075789576_n

আমি অনিক । ঢাকার খুব নামকরা একটা ভার্সিটি তে পড়ি ।
আমি যখন ক্লাস নাইনে পড়ি তখন একটা মেয়েকে ভালবাসতাম । সেই সম্পর্ক প্রায় তিন বছর টেকে ।
কিন্তু একটা সময় আমার আর ওর মনে হল আমরা বোধহয় আর সম্পর্ক চালাতে পারব না । দুজনের মাঝে নানা ধরনের বিরোধ তৈরি হতে লাগল ।
একটা সময় ওই মেয়ে বুঝতে পারল আমি আর তাকে ভালোবাসি না । তাই সে নিজেই আমার কাছ থেকে দূরে সরে গেল ।
এরপর এলাকার এক বড় ভাই এর সাথে আমার ঘনিষ্ঠটা দিন দিন বাড়তে থাকে ।
যদিও আমাদের মাঝে কোন শারীরিক সম্পর্ক ছিল না ।
আমি আর সেই বড় ভাই দুজনেই ভালো বন্ধু ছিলাম ।
কিন্তু একদিন সেই বড় ভাই আমাকে ভালোবাসার প্রপোজ করে ।
তখন আমি বুঝতে পারি সমকামিতা ব্যপার টা কি ।
এমনকি তখন আমি এটাও বুঝতে পারলাম আমার ভেতর ও সমকামিতা আছে । যেটা এতদিন টের পাই নি ।

আমার কাছে সমকামীদের মাঝে সেক্স টা ভালো লাগত না । কেন জানি ?
তাই আমি কারো ভালোবাসার ডাকেই সাড়া দিই নি ।
যাই হোক ।
একসময় অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হই ।
আমাদের যেদিন নবীন বরণ উৎসব সেদিন আমাদের ডিপার্টমেন্ট এর পক্ষ থেকে এক বিশাল প্রোগ্রাম এর আয়োজন করা হয় ।
সেই প্রোগ্রামে আমি ড্যান্স করি আর রেম্প এ অংশ নিই ।
এরপর শুরু হয় মঞ্চনাটক ।
সেখানে ‘মনসুর’ নামে একজন বড় ভাই খুব ভালো অভিনয় করেন ।
নাটকটা আমরা সবাই খুব এঞ্জয় করি ।
পরে উনাকে গিয়ে অনেক উইশ করি ।
ভার্সিটিতে ক্লাস আড্ডা সব ভালই যাচ্ছে ।

কি মনে করে একদিন ফেসবুকে একটা ফেইক আইডি খুললাম ।
খোলার দুই তিন দিনের মধ্যে ঝড়ের মত ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট আসতে লাগল ।
আমিতো পুরাই অবাক ।
আমি সবার সাথে চ্যাট করতাম না । কেননা বেশিরভাগ গে দের একটাই চাওয়া । সেটা হল সেক্স।
এভাবে একদিন একটা অবাক করা ঘটনা ঘটল ।
ফেসবুকে ব্রাউজ করছি । একটা ছেলের আইডি তে ঢুকলাম ।
ঢুকে তার ছবি আর ইনফো দেখছি ।
আচমকা মনে হল এই ছেলেটার ছবি আমি কোথায় যেন দেখেছি ।
আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম ।
কোথায় দেখেছি সেটা মনে করার চেষ্টা করলাম ।
পরে মনে পড়ল এটা সেই মনসুর ভাই এর ছবি যে মনসুর ভাই আমাদের নবীন বরণ উৎসবে নাটক করেছিলেন ।
প্রোফাইলের ইনফো তে দেখলাম উনি একজনের সাথে রিলেশানে আছেন ।
সাথে সাথে আমার কৌতূহল দ্বিগুণ বেড়ে গেল ।
দেখলাম উনি যার সাথে রিলেশানশিপ স্ট্যাটাস দিয়েছেন সে একটা ছেলে ।
আমি বুঝলাম মনসুর ভাই সমকামী ।
আমি মনসুর ভাই আর উনার বয় ফ্রেন্ড কে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠালাম ।
মনসুর ভাইয়াকে একটা মেসেজ ও দিলাম, “ভাইয়া, আপনাকে আমি চিনি । আমি অমুক ভার্সিটিতে অমুক ডিপার্টমেন্টে পড়েন না ?”
এই বলে মেসেজটা ফেসবুকে পাঠালাম ।
মনসুর ভাই সাথে সাথে আমাকে জানতে চায়, আমি কে ? কোথায় থাকি ? এসব ।
আমি পরিচয় গোপন রাখি ।
এর মাঝে উনাদের সাথে ফেসবুকে মাঝে মাঝেই কথা হত ।
যাই হোক ।
২০১১ সালের পহেলা বৈশাখ । রাতে মনসুর ভাই তার বয় ফ্রেন্ড এর ছবি তার আইডি তে লোড দিলেন ।
তার বয় ফ্রেন্ড এর ছবি দেখে আমি পুরাই টাস্কি খেয়ে গেলাম । প্রেমে পড়ে গেলাম ।
মানুষ এতো কিউট হয় !

২৩ শে এপ্রিল মনসুর ভাইয়ার বয় ফ্রেন্ড কে আমি চ্যাট এ পাই । সাথে সাথে নক করি ।
চ্যাট করে আমার পরিচয় দিতেই উনি বললেন মনসুর ভাইয়ার কাছে উনি আমার কথা শুনেছেন ।
মনসুর ভাই নাকি আমার কথা উনার কাছে বলেছেন সব ।
আমি বললাম, ভাইয়া আপনার নাম কি ?
উনি বললেন, মেঘ ।
জানতে পারলাম মেঘ ভাইয়া আমার চাইতে দেড় বছরের বড় । টানা ২ ঘণ্টা চ্যাট করলাম সেদিন । মেঘ ভাইয়া আমার সাথে দেখা করতে চাইলেন ।
আমি রাজি হলাম ।
আমি মেঘ ভাইয়ার কাছে জানতে পারলাম মনসুর ভাইয়া আর উনি একসাথে লিভ টুগেদার করেন । থাকেন একই এপার্টমেন্টে ।
মেঘ ভাইয়া আমাকে তাদের বাসায় যেতে বলল ।
আমি পরদিন ২৪ এপ্রিল মেঘ ভাইয়ার সাথে দেখা করতে যাই । বাসায় মেঘ ভাইয়া একা ছিলেন ।
ওদের বাসায় গিয়ে আমার খুব হিংসা হচ্ছিল । কেমন সাজানো গোছানো । ছিমছাম ।
ছোট একটা পরিবারের বাসা ।
মনে মনে ভাবছিলাম, ইস ! আমার যদি এমন কেউ থাকত !
আমি প্রান খুলে ওদের দুজনের জন্যই দোয়া করলাম ।
সেদিনের মত চলে আসলাম ।
এর দুইদিন পর মেঘ ভাইয়া আমাকে মেসেজ দিয়ে আবার দেখা করতে বলে ।
আমি মেঘ ভাইয়ার জন্য পাগল । তাই উনি বলার সাথে সাথেই রাজি হই ।
আমি আবার দেখা করি উনার সাথে । উনাদের বাসায় । সেদিনও মেঘ ভাইয়া বাসায় একা ছিলেন । আমরা দুজনে অনেক আড্ডা দিই ।
যাবার সময় মেঘ ভাইয়া বলল, সাবধান ! আমাদের দেখা হবার কথা মনসুর কে কখনো বলবে না ।
আমি বললাম, ঠিক আছে ভাইয়া ।
এরপর থেকে আমরা প্রায়ই দেখা করতাম ।

একদিন মেঘ ভাইয়া বলল, অনিক । আমি ১৫ দিনের জন্য গ্রামের বাড়ি যাচ্ছি ।
আমি অবাক হলাম শুনে । বলে রাখা ভালো মেঘ ভাইয়া আর আমার গ্রামের বাড়ি এক জেলায় ছিল ।
যাই হোক । মেঘ ভাই গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার পর উনার সাথে ফেসবুকে যোগাযোগ রাখতাম । চ্যাট করতাম ।
যেহেতু আমার ফেসবুকে অনেক ফ্রেন্ড তাই মাঝে মাঝেই উনার চ্যাট এর রিপ্লাই দিতে আমার দেরি হয়ে যেত ।
মেঘ ভাইয়া এতে খুব রাগ করল ।
রাগ করে সে চ্যাট থেকে অফলাইন হয়ে গেল । এমনকি তার সেল ফোনটাও অফ করে ফেলল ।
আমি অবাক । মেঘ ভাইয়ার এই রকম আচরন দেখে । কেননা মেঘ ভাইয়াকে আমি বন্ধু ছাড়া অন্য কিছু কখনও ভাবি নি তখনও । আর উনার আচরন দেখে মনে হচ্ছিল আমি উনার বয় ফ্রেন্ড ।
এর মাঝে উনার সাথে আর যোগাযোগ হয় নি কয়েকদিন ।
৩-৪দিন পর আমি পারিবারিক কাজে আমার গ্রামের বাড়িতে যাই ।
সেখানে গিয়ে মেঘ ভাইয়াকে ফোন দিলাম ।
মেঘ ভাইয়ার ফোন খোলা পেলাম ।
উনি ফোন ধরল ।
আমি মেঘ ভাইয়াকে দেখা করতে বললাম ।
মেঘ ভাইয়া রাজি হল । সেদিন দেখা হবার পর উনাকে খুব বকাঝকা করলাম ।
মেঘ ভাইয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আমার কাছে সরি বলল ।
সেদিন দুজন ঘুরলাম আর আড্ডা দিলাম । ভালই গেল কিছুদিন ।
এরপর আমরা ঠিক করলাম দুজন একসাথে ঢাকা বেক করব ।
দুইটা টিকেট কাটলাম । পাশাপাশি সিটের ।
তখন পড়ন্ত বিকেল । হালকা সোনালী আলো চারদিকে ।
আমি আর মেঘ ভাইয়া বাসে বসে আছি ।
বাস ছেড়েছে বেশ খানিকক্ষণ আগেই ।
আমরা দুজনই স্বাভাবিক কথা বার্তা বলে যাচ্ছি ।
একটু পরই সন্ধ্যে নামল ।
বাসের ভেতরের আলো নেভানো ।
বাইরের অল্প অল্প আলো মাঝে মাঝে এক মায়াময় পরিবেশ সৃষ্টি করে যাচ্ছে ।
আমার চোখ লেগে আসছিল হালকা ঘুমে ।
একটা সময় অনুভব করলাম মেঘ ভাইয়া আমার ডান হাত ধরে আছেন ।
আমার সারা শরীরে অদ্ভুত একটা শিহরন বয়ে গেল । বিদ্যুৎ চমকের মত ।
আমার হাত নিয়ে মেঘ ভাইয়া তার গালে ঘষল ।
আমার যে কি ভালো লাগছিল বলে বুঝাতে পারব না ।
তখন বাসের ভেতর জমাট আঁধার ।
মেঘ ভাইয়া তার মুখ এগিয়ে এনে আমার ঠোঁটে ঠোঁট রাখে ।
আমি সাড়া দিই ।
চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিই । উনাকে আমি কেমন করে ফেরাব ? কারন মনে মনে হয়ত উনাকে আমি চাইতাম !
মেঘ ভাইয়া আমার ঠোঁটে গলায় কিস করে একের পর এক ।
বুঝলাম আমরা দুজন দুজন কে ভালোবাসি । সেটা গ্রামের বাড়ি না গেলে দুজনই বুঝতাম না ।
চলন্ত বাসেই আমাদের প্রথম চুম্বন ।
এর পর থেকেই আমি আর মেঘ ভাইয়া একজন আরেকজন কে প্রান দিয়ে ভালোবাসি ।
আমাদের সম্পর্কের এখন ২ বছর চলছে ।
আমি জানি মনসুর ভাইয়া হয়ত অনেক কষ্ট পেয়েছে !
কিন্তু ভালোবাসা আসলে অদ্ভুত ! কখন কে কোথায় কিভাবে যে প্রেমে পড়ে সেটা কেউ জানে না , কেউ বুঝতে পারে না ।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s