তোমাকে ছাড়া আমি ভালো নেই


পায়ে স্যান্ডেল ।
একটা লাল টিশার্ট । পরনে জিন্স ।
ডান হাতে তোমার দেয়া ব্রেসলেটটা এখনও আছে ।
আমি যে পথ ধরে হাঁটছি তার দুপাশে কাঁঠাল গাছের সারি ।
লাল মাটির রাস্তা ।
আশে পাশে দু একটা পেয়ারা বাগান ।
আমার যখন খুব মন খারাপ থাকে তখন এখানে চলে আসি । এটা তুমিও জানো ।
আজ সকাল থেকেই ভীষণ মন খারাপ ছিল । তাই বাবা মা কে কিছু না বলেই গাড়ি ড্রাইভ করে একা একা চলে আসলাম ।
আমি বোধহয় একটু পাগলাটে ।
তুমি বলতে, আমি নাকি ছোটো বাবু ।
আমি বলতাম, শিশির । আমি তোমার ছোট বাবু ।
শিশির আমার বয় ফ্রেন্ড । টানা ৪ বছর ওর সাথে সম্পর্ক আমার ।
পুরনো কথা মনে করতে আমার ভালো লাগে না ।
তারপরেও ঘুরে ফিরে এসব মনে হয় ।

আমার ডান পাশে একটা পুকুর । পুকুরের পানিতে সবুজ সবুজ শেওলা । ভর দুপুর । তাই আমার মত পাগল ছাড়া আশে পাশে কেউ নেই ।
এখানকার মানুষ কত সুখি । চাওয়া পাওয়া কম । সারাদিন মাঠে কাজ করে । রাত হতেই আরামের ঘুম ।
আমার মত জটিল মানসিক কষ্ট নেই ।
কোথায় যেন পড়েছিলাম, মানুষের চাওয়া পাওয়া যত বেশী হয় কষ্টের পরিমাণটাও তত বাড়ে ।
আমি পুকুরের ঘাটে বসি । আমাদের বাগান বাড়ির পুকুর ঘাট ।
ঘাটটা কোন বাধানো ঘাট না । কয়েকটা নারকেল গাছের গুঁড়ি ফেলে ঘাট বানানো হয়েছ ।
আমি সেখানটায় বসে পুকুরের সবুজ পানি দেখি ।
একটা জল ঢোঁড়া সাপ সাঁতার কেটে যাচ্ছে । হলদে কালোয় মেশানো সাপের শরীর ।
আমি অবাক হয়ে দেখি ।
আমার বা দিকের পানিতে রাখা বাঁশের কঞ্চিগুলোতে কতগুলো ফড়িং এর উড়ো উড়ি।
ছোটবেলায় যখন বাবার সাথে এখানে আসতাম তখন খুব ফড়িং ধরতাম ।
ছোটো একটা লাঠিতে কাঁঠালের আঠা লাগিয়ে অপেক্ষা করতাম । ফড়িং এসে বসতেই আটকে যেত ।
আমি ফড়িং পাওয়ার আনন্দে বাবার কাছে ছুটে যেতাম ।
বাবা হাসত । আমার ছেলে মানুষী দেখে ।
শিশিরও হাসত একটা সময় ।
সেবার যখন শিশিরের সাথে প্রথম ঘুরতে যাই ঢাকার বাইরে । আমি সারাটা রাস্তা ওর কাঁধে মাথা রেখেছিলাম । শিশির মাঝে মাঝে বলত, এই মাথা তোল । বাসের সবাই দেখছে ।
আমি হেসে বলতাম দেখুক ।
শিশিরকে যেদিন প্রথম প্রপোজ করি সেদিনও অনেক পাগলামি করি আমি ।
ঐদিন দুজন চারুকলায় হাঁটছি ।
সবে সন্ধ্যে নেমেছে । আশে পাশে খুব একটা মানুষ জন নেই ।
আমি হথাত তার সামনে হাঁটুগেড়ে বসে ওকে বলি, ভালোবাসি ।
শিশির আমার সামনে বসে । আমার থুতনিতে হাত রেখে বলে, তোমার মত পাগল ছেলেকে না ভালবেসে থাকা যায় ?
সেদিন ওকে জড়িয়ে ধরে কত যে চুমু খেয়েছি তার হিসেব নেই ।

রেস্টুরেন্ট এ খেতে গেলেই আমি গোঁ ধরতাম আমাকে খাইয়ে দেবার জন্য ।
শিশির লজ্জা পেত । বলত, আচ্ছা একটা ছেলে আরেকটা ছেলেকে খাইয়ে দিলে মানুষ কি বলবে ?
আমি কোন কথা শুনতাম না । গাল ফুলিয়ে বসে থাকতাম ।
ও একসময় হেসে চামচ দিয়ে খাইয়ে দিত ।
তখন নিজেকে বিশ্বজয়ী মনে হত ।

শিশির যখন খুব অসুস্থ হওয়া শুরু করল তখন রাত দিন আমি ওর পাশে থাকতাম ।
আমার ভয় করত । মনে হত আমি যদি ওকে আমার চোখের আড়াল করি ওর হয়ত খারাপ কিছু হয়ে যাবে ।
রাতের পর রাত ওর মাথার কাছে বসে থেকেছি ।
শিশিরের মা বলত, বাবা ! এমন কেন হল ? আমার ভালো ছেলেটার কেন এতো বড় অসুখ হল ?
আমি ঠোঁট কামড়ে আমার কান্না আটকে রাখতাম, বলতাম, খালাম্মা ! দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে । যদিও আমি জানি আসলে কিছুই ঠিক হবে না । আমি মেডিকেল এর স্টুডেন্ট । আমি জানি ডাক্তারদের রিপোর্ট অনুযায়ী ওর রক্তের আয়ু ক্রমশ কমে আসছে । হয়তো সময় খুব বেশী নাই ।
আমি শিশিরকে কিছু বুঝতে দিই না ।
ওর ভীষণ ফ্যাকাসে মুখটার দিকে চেয়ে ইচ্ছে করে হাসি । কারণে । অকারণে ।
শিশির আমাকে ডেকে বলে, আমার পাশে একটু বসবে অর্ক ।
আমি হসপিটালের ব্যাডে ওর পাশে বসি ।
আমার হাত ধরে শিশির তার দুর্বল চোখে তাকায় আমার দিকে । বলে, আমাকে খুব বেশী ভালবাস ? তাই না!
আমি বলি, নাহ । তোমাকে অনেক ঘেন্না করি আমি ।
আমি মেঝের দিকে তাকাই । আমি জানি ওর চোখে তাকালে ও সব জেনে যাবে । ও জেনে যাবে ভেতরে ভেতরে আমি কতটা পুড়ছি । কতটা নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছি ।
শিশির আমার চুলে তার হাত বুলায় ।
আমার চুল এলোমেলো করে দিয়ে বলে, অর্ক । চুলে শ্যাম্পু করনি কতদিন । কি যে জংলি হচ্ছ ?
আমি হেসে উঠি , বলি , তুমি সুস্থ হয়ে আমাকে আগের মত গোসল করিয়ে দিও ।
শিশির বাইরের জানালার দিকে তাকায় ।
বাইরে অল্প আলো । সূর্য ডুবতে বসেছে ।
শিশির সেদিকে তাকিয়ে বলে, অর্ক । আমার ভীষণ বাঁচতে ইচ্ছে করে ।
আমি ওকে জড়িয়ে ধরি , বলি, এই বোকা ! কিসব আবোলতাবোল কথা বল ?
শিশির আমার দিকে তাকায় না । জানালার দিকে তাকিয়ে বলে, অর্ক একটা গান শোনাবে ?
আমি বললাম, কোন গানটা । বল ?
শিশির বলে , ওই যে, ওই গানটা , “ যদি মন কাঁদে তুমি চলে এস এক বরষায়”
আমি গলা কাশি দিয়ে গান শুরু করলাম ।
শিশির আমার কাঁধে মাথা রাখে ।
আমি গান গাইছি । পুরোটা গাইতে পারছি না । আবেগে গলা ধরে আসছে । চুপ করে রইলাম ।
শিশির আমার থুতনিতে হাত দিয়ে বলে, থামলে যে !
আমি চুপ করে থাকি ।
শিশির আমার হাতের আঙ্গুল নিয়ে তার গালে ঘসে । আমায় বলে, আরেকটা শ্রাবণ যদি পেতাম ! তোমায় নিয়ে আবার বৃষ্টিতে ভিজতাম । ভিজে ভিজে চা খেতাম । বৃষ্টির পানি ফোঁটায় ফোঁটায় আমাদের চায়ের কাপে পরত । তাই না অর্ক ।
আমি প্রানপনে ঠোঁট কামড়ে আছি । একদম স্থির ।
শিশির বলে, অর্ক । আমার খুব খারাপ লাগছে । লাইট টা নিভিয়ে দাও ।
আমি ব্যস্ত হলাম । ওকে বিছানায় শুইয়ে দিলাম । দৌড়ে বের হয়ে ডাক্তার কে নিয়ে আসলাম ।
খালাম্মা, খালু সবাই দৌড়ে আসলো ।
ডাক্তার বলল , অবস্থা খুব খারাপ । এখনই আই সি ইউ তে নিতে হবে ।
দ্রুত ওকে নিয়ে যাওয়া হল ।
খালাম্মা ডুকরে ডুকরে কাঁদছেন । খালু চুপচাপ বসে আছেন । ওর আত্মীয় স্বজন সবাই চুপচাপ বসে আছে ।
আমি হসপিটালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকি । আকাশ দেখি ।
ব্যস্ত শহরের রাস্তায় সবাই ব্যস্ত ।
আমি ভেউ ভেউ করে কেঁদে ফেলি । খুব একা লাগে আমার । আমি বুঝতে পারি আমি শিশিরকে হারিয়ে ফেলব । খুব শিগগিরই ।
রাতে খাইনি । কাঁচের ওপাশে রাখা ওর নিথর শরীর দেখছি ।
ডাক্তার একটু পর ওর লাইফ সাপোর্ট খুলে নিল ।
খালাম্মা কথা বলছে না ।
আমি কি করব বুঝতে পারছিলাম না । শিশির অন্ধকার খুব ভয় পেত । ও বোধহয় এখন খুব ভয় পাচ্ছে ।
আমি কত অসহায় । এতো কাছে থেকেও ওর হাতে হাত রেখে বলতে পারছি না । ভয় পেও না । আমি পাশেই আছি ।

শিশির মারা যাবার পর আমি এক ফোঁটা কাদিনি । আমি পাথর হয়ে গিয়েছিলাম ।
উদ্ভ্রান্তের মত হাঁটতাম শাহবাগ, পরিবাগ আর ধানমণ্ডির রাস্তা ধরে ।
মনে হত ও আমার পাশে পাশে হাঁটছে । আমায় বলছে, অর্ক । আমার খুব পানি পিপাসা পেয়েছে । একটু পানি খাব ।

ফোনের রিং টোনের শব্দে আমি অতীত থেকে ফিরে আসলাম ।
মা ফোন দিয়েছে ।
ফোনটা ধরলাম , কিরে বাবা ! কোথায় তুই ? সাত সকালে উঠে কোথায় গেলি ?
আমি মাকে বলি, মা । আজ ২ ফেব্রুয়ারী । শিশিরের জন্মদিন ।
মা কিছু বলে না । চুপ করে যায় । আমি বুঝতে পারি মা কাঁদছে ওপাশে ।
আমি ফোন রেখে দিই ।
আমাদের এই বাগানবাড়িটা শিশিরের খুব প্রিয় ছিল ।
সময় পেলেই আমি আর ও এখানে আসতাম ।
কত রাত একসাথে মাঠে শুয়ে শুয়ে তারা দেখেছি তার হিসেব নেই ।
এখানকার ঘাস গুলো তে ওর স্পর্শ আছে ।
আমি এই ভরদুপুরে মাঠের ঘাসে চিত হয়ে শুই ।
গনগনে দুপুরে আকাশ দেখি ।
দিনের আকাশে তারা দেখা যায় না । অথচ তারা গুলো ঠিক লুকিয়ে থাকে ।
কি আশ্চর্য ব্যপার ।
আলোর মাঝেও লুকনো যায় ?
আমার চোখ ফেটে কান্না আসে ।
আমার খুব চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে । বলতে ইচ্ছে করছে, শিশির ! তোমার জংলি আর ছোটবাবুটাকে ফেলে তুমি কেমন করে গেলে । ও যে আজ ভীষণ একা । খুব একা । অনেক একা ।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s