দীর্ঘশ্বাস


ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেছে বেশ কিছুক্ষন হল ।
আমি ইচ্ছে করেই মোম জ্বালাই নি ।
মা পাশের রুম থেকে বলল, কিরে ! অন্ধকারে কি করিস ?
আমি বললাম, কিছুনা মা ।
বসে আছি জানালার গ্রিল ঘেঁসে ।
এখান থেকে সামনের রাস্তাটার অনেকখানি দেখা যায় ।
অবশ্য অন্ধকারে দেখা না দেখা সমান কথা ।
আজকাল অন্ধকারে বসলেই ফেলে আসা সময়ের কথা মনে হয় ।

চোখ বুজলেই মনে হয় এইতো সেদিন ।
আমি আর রঞ্জন হাত ধরে হাঁটছি । তখন সবে ক্লাস নাইনে উঠেছি । হালকা দাঁড়ি গোঁফ গজাচ্ছে ।
বুকের পশম । শরীরের অবাঞ্ছিত লোম ক্রমশ মাথা চাড়া দিচ্ছে ।
রঞ্জন ছিল ভীষণ দুষ্ট । সারাদিন মেয়েদের সাথে টাংকি মারাই তার কাজ ছিল ।
সন্ধ্যায় প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার সময় সব দুষ্টুমির ফিরিস্তি শুনাত আমায় ।
আমিই বোধহয় তার একমাত্র মনোযোগী শ্রোতা ছিলাম ।
প্রাইভেট পড়া শেষে দুজন চা খেতাম পাড়ার দোকানের লালু ভাই এর ছাপরা দোকানটাতে ।
যখন বাসায় ফেরার সময় হত ! আমার মনে হত কি যেন ফেলে যাচ্ছি ।
রঞ্জনের তেমন কোন ভাবান্তর হত না ।

বাসায় এসে হাতমুখ ধুয়ে পড়তে বসতাম ।
কিন্তু আমার মন থাকত রঞ্জনের কাছে ।
মনে হত আমি কি ওকে ভালবাসি ? আশ্চর্য ! আমিতো একটা ছেলে ! তাহলে ওকে ভালবাসব কেন ?
আমাকে অনেক মেয়ে পছন্দ করে । অনেক মেয়েই আমার জন্য পাগল ।
ছি ছি রঞ্জন জানতে পারলে কি মনে করবে ?
মন থেকে রঞ্জনের চিন্তা দূর করার চেষ্টা করি ।
বৃথা চেষ্টা ।

ইরেশ তোর চা । মা এর ডাকে বাস্তবে ফিরে আসলাম ।
মা এখানে বস । একসাথে চা খাই ।
মা আমার ডান পাশে বসল ।
মা, তোমার রঞ্জনের কথা মনে আছে ?
বাহ! ওর কথা মনে থাকবে না ! তুই আর ও কত ভালো বন্ধু ছিলি ।
মা, রঞ্জন এখন কোথায় জানো ?
নাতো ! তুই কি কোন খবর জানিস ?
হুম ! শুনেছি ও এখন লন্ডন থাকে । বিয়েও করেছে এক বিদেশীকে ।
বাহ ! ছেলেটা আসলেই চালু । সেই ছোট বেলা থেকেই ।
বাসার ল্যান্ড ফোনটা বেজে উঠল । মা দৌড়ে গেল । নিশ্চিত ছোট খালা ফোন দিয়েছে । এখন ম্যারাথন কথা চলবে ।
আমি আবার বাইরের অন্ধকার দেখি । চা এর মগে চুমু দিই ।

ফিরে যাই আবার আগের সময়টাতে ।
এস এস সি এক্সাম শেষ হল কিছুদিন আগে ।
সেদিন ছিল পহেলা বৈশাখ ।
রঞ্জন আর আমি সকাল থেকে ঘুরছি । এখানে ওখানে । অনেক মজা করেছি ।
দুপুরবেলা ওকে জোর করে আমার বাসায় নিয়ে আসি ।
একসাথে খাওয়া দাওয়ার পর ও আমার রুমে আসল ।
বলল, আজ একটা কথা বলব ইরেশ ।
আমি বললাম, খুব জরুরি কথা নাকিরে!
রঞ্জন বলল, হুম । আচ্ছা রঞ্জন ! আমি প্রেমিক হিসেবে কেমন ?
আমি হা হা করে হেসে বললাম, ধুর ! বাল ! আমি কেমনে কমু ? আমি কি তোর সাথে প্রেম করেছি নাকি ?
রঞ্জন বলল, দেখ ! তুই আমার সবচাইতে কাছের বন্ধু ।
আমি মাথা নাড়লাম ।
রঞ্জন শুয়া থেকে উঠে বসল ।
আমার হাতে হাত রেখে বলল, দোস্ত । আমি তোর খালাত বোন মুমুকে অনেক ভালবাসি ।
আমি কথাটা শুনার জন্য তৈরি ছিলাম না ।
বিশাল একটা ধাক্কা খেলাম বুকের খাঁচায় । হা হা করে মিথ্যে হাসলাম । বললাম, ও এই কথা !
ভালো !
রঞ্জন বলল, দোস্ত আমায় হেল্প করতে হবে ।
আমি বললাম, হুম ।
সেদিন আর বেশি কিছু বলতে পারিনি আমি ।
অইরাতে আমি এক ফোঁটা ঘুমাই নি ।
পরদিন মাবাবাকে বললাম, ঢাকা যাব । কোচিং করতে । বাবা মা মহা খুশি । কারণ তারাও চান আমি ঢাকায় যাই । আমিই এতদিন রাজি হচ্ছিলাম না ।
বাবা আগামী পরশুই নিয়ে যাবেন বললেন ।
আমার বুকের ভেতর তোলপাড় ।
আমি আসলে পালাতে চাচ্ছিলাম রঞ্জনের কাছ থেকে ।
বিকেলে রঞ্জনের সাথে দেখা ।
ওকে কিছুই বললাম না ।
রঞ্জন বলল, কিরে ! তোর কি মন খারাপ নাকি !
আমি বললাম, নারে ! ভালো আছি ।
পরশু ওকে কিছু না জানিয়েই আমি ঢাকায় চলে আসি ।
খালার বাসায় ।
বাবা যখন আমাকে কোচিং এ ভর্তি করিয়ে চলে যাচ্ছিল । আমার তখন নিজেকে খুব নিঃস্ব মনে হচ্ছিল ।
আমি জানি । আমি রঞ্জনের কাছাকাছি থাকলে আমি ওর প্রতি আরও দুর্বল হয়ে যাব । আরও কষ্ট পাব ।
তাই আমি স্বেচ্ছায় নির্বাসন নিলাম ।

আজ এতো বছর পর এসব কেন মনে হচ্ছে জানি না ।
তবে একটা কথা বার বার মনের ভেতর কড়া নাড়ছে, সেদিন যদি এভাবে না পালাতাম ! আমি কি রঞ্জনকে আপন করে কখনো পেতাম ! ভালোবাসার মানুষ হিসেবে ? কে জানে ! আর পেলেই কি লাভ হত ! আমাদের সমাজ সংসার এই সম্পর্ক কখনই মেনে নিত না । যতসব পাগলের প্রলাপ ভাবছি ।

মা ফিরে আসল । বলল, ইরেশ । তোর ছোট খালা তোর জন্য খুব ভাল একটা মেয়ে দেখেছে ।
কাল আমরা মেয়ে দেখতে যাব ।
আমি মার মুখের দিকে চেয়ে হাসলাম । বললাম, হুম ।
বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসল । এই হোল আমাদের বাঙালি সমকামী পুরুষদের সর্বশেষ অবস্থা !!!

2 thoughts on “দীর্ঘশ্বাস

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s